এক মুঠো পানি | তারিকুজ্জামান তনয়
এক মুঠো পানি
তারিকুজ্জামান তনয়
ঈদের দশ দিন ছুটি কাটানোর পর গ্রামের বাড়ি থেকে এসে অফিস শেষ করে আবার বাসায় ফেরা হল। বাড়ি থেকে ভোর বেলায় রওনা দিয়ে এসে আবার দশ ঘন্টার অফিস। সব মিলে ধকলটা শরীর ও মন- উভয়ের উপরে পড়েছে।
বসতবাড়িতে তেলাপোকার বেজায় উপদ্রব। তাই ছুটিতে যাওয়ার দিনে দেশি-বিদেশি কয়েক প্রকারের ঔষধ ছিটিয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম। চিনিগুঁড়া দানার মতো ঔষধ দিয়ে বিদেশি তেলাপোকা, আর পাউডার জাতীয় ঔষধ দিয়ে বড় তেলাপোকা মারার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। উপদ্রবের মাত্রা বিবেচনা করে করে অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণ ঔষধ ছিটিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়। মোটের উপর, সম্ভাব্য প্রায় সকল জায়গাতেই তেলাপোকা মারার ঔষধ দেয়া হয়।
বাসায় ফেরার পূর্বে এ বিষয়টা মাথায় ছিল। কিন্তু বাসায় পৌঁছে ঘরের দরজা খোলাতেই মাথা গরম হয়ে গেলো। এতো রাগঢাক করার পরও, এতো খরচপাতি করার পরও মাত্র দশ থেকে পনেরো টি তেলাপোকা (দেশি-বিদেশি মিলে) মারা পড়েছে।
গ্রামের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে এসেছিলাম কাজের বুয়াকে বলে দিতে, যেন সে সন্ধ্যা বেলায় এসে পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। কিন্তু অফিসে বসেই খবর পেলাম, বুয়া আসতে পারবে না। তারা কোথাও যেন ঘোরতে গিয়েছে।
এদিকে রাতের খাবার বাহির থেকে কিনে আনা হয় নি। রান্না করে খেতে হবে। অবশ্য আগে থেকেই ডিপফ্রিজে কিছু তরকারি রান্না করে রাখা ছিল। শুধু ভাত রান্না করে সেটা গরম করলেই চলবে। আর সেই সাথে একটা ডিম ভাজি।
পৃষ্ঠা-০১
তবুও তো একটা সময় লাগবে। তার উপর মেঝের যে বিশ্রী অবস্থা! সব মিলে, একটা বিরক্তির আভা শরীর ও মন ছেয়ে গেল।
যাইহোক, মেঝেতে যদি শুধু ধুলো জমে থাকতো তবে হয়ত একবার ঝাড়ু দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া যেতো। কিন্তু, এখন যেহেতু মেঝে জুড়ে ঔষধ ছড়ানো-ছিটানো আছে, তাই কমপক্ষে দুইবার ঝাড়ু দিতেই হয়।
আরও সময় পার হলে রাত বেড়ে যাবে। তাই আর বিলম্ব না করে ঝাড়ু দেওয়া শুরু করে দিলাম।
আমাদের বাসায় দুইটি রুম। একটাতে পড়ার টেবিল সহ অন্যান্য ব্যবস্থা। এই রুমের মেঝেতে ঠিক জানালার আলো যেখানে পড়ে সেখানে দুইটি টব রাখা আছে। একটি টব তাসনীম বাবুর, আর অন্যটি ত্বহা সোনার। টবগুলোতে আছে মানিপ্লান্ট ও রাংচিতা গাছ। তাসনীম ও ত্বহা ওরা দু’জনেই টব দুইটোকে পড়ার টেবিলে রাখে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার কারণে জানালার কাছে আলোয় রাখা হয়।
দশ দিন পর বাসায় ফেরা। মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার সময় টবে থাকা গাছের বিবর্ণ রং চোখে পড়ে। কিন্তু, মনের ভেতর তেমন তাগিদ অনুভব হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, বিরক্তি বা ক্লান্তিবোধ অনেক সময় দায়িত্ব বা কর্তব্যকে হালকা করে তুলে।
ঝাড়ু শেষ করে ডিপফ্রিজে থাকা মাংস ও ইলিশ মাছ রান্না করা ছিল। তা গরম করা হলো। ভাত রান্না ও ডিম ভাজি করে খেয়ে শুয়ে পড়া হলো।
আসলে জীবনটা একটা দোদুল্যমান দোলনা। ঠিক যে শুধু দোলনা তা নয়; বরং জীবনের কিছু বিষয় থাকে যা ওই দোলনার
পৃষ্ঠা-০২
মতো চলে গিয়ে আবার ফিরে আসা হয়। আবার কিছু বিষয় থাকে যা একেবারেই ছেড়ে দিতে হয়। এই তো দশ দিন আগে, কত উৎসব আনন্দ মনের ভেতরে পোষণ করে বাড়িতে যাওয়া হলো। আর সেখান থেকে আবার সেই কর্মচঞ্চলতার মাঝে ফিরে আসা হলো। জীবন এমনই, মন বলে আমরা পাখির মতো স্বাধীন; কিন্তু পরক্ষণেই দায়িত্ব আবার টেনে নামিয়ে আনে মর্তে।
পরের দিন-
নামাজ শেষ করে, আবার ঘুম দিয়ে সকাল পনে আটটার দিকে ওঠা হলো। ছুটিতে বাড়ি থাকাবস্থায় একটা গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। এরপর আবার সেই গল্প নিয়ে বসা হলো। বিষয়টা এমন ছিল যে, শুধুমাত্র দুই জন ব্যক্তি (দম্পতির) মাঝে জাগতিক নানান বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা। লেখাটি বেশ কঠিন ছিল। একদিকে গল্পের ধারা, অন্যদিকে পাঠকের মনের খোরাক। সব মিলিয়ে, গল্পটি লিখতে বেশ চিন্তা ভাবনা করে লিখতে হয়েছে।
এর মাঝে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা বলতে হয়েছে। বুঝতে হবে প্রাণের অর্ধেক বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে। তার সাথে যতটুকু প্রেম চলে, তার অধিক দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে আলোচনা চলে। জানা তো আছেই, ফুলের ঘ্রাণ আর ঘটি-বাটির শব্দ এক সাথে পথ চলে না।
সময় হয়ে গিয়েছে। অফিসে যেতে হবে। তখনও টবের উপর সকালের রোদ পড়ে আছে। টবের উপর চোখ পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ, আমি টবে থাকা গাছগুলোর সর্বোচ্চ সৌন্দর্যটাকে-যে দেখেছি।
পৃষ্ঠা-০৩
নানান লম্ফঝম্ফ শেষ করে অবশেষে অফিসের পথে আগ বাড়ালাম। অফিস অনেকটা চুম্বকের মতোই। সময় হলে ব্যক্তি যেখানেই থাকুক না কেন, সেখান থেকেই তাকে টেনে আনে। আবার সময় শেষ হলে, অফিস থেকে বিদায় নিতে হয়।
ঘুমানোর আগে রাতের সময়টুকুও নানান কর্মচঞ্চলতায় কেটে গেল। বাসায় ফিরে ভাত রান্না করা, তরকারি গরম করা। সেই সাথে ডিম ভাজি করা। সারাদিনের ক্লান্তি ও চূড়ান্ত সময় নষ্টকারী নেট ব্রাউজিং ও এর সমসাময়িক খবরগুলো।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সোফায় বসে যখন পানি পান করছিলাম, তখন এক হাতে পানির বোতল আর অন্য হাতে নিজের ব্যবহার করা ফোন ছিল। আঁড় চোখে পূর্ণ মনোযোগ ছিল ওই ফোনের স্ক্রিনের ওপর। এরপর উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে আবার সোফায় বসে যখন পানি পান করছিলাম তখন আবারও টবের উপর চোখ পড়ল। মনের ভেতরটা আবারও বেদনায় ছেয়ে উঠল। টবটি গাঢ় সবুজ পাতায় ছেয়ে ছিল। আর এখন কেমন মলিন হয়ে পড়ে আছে।
পৃষ্ঠা-০৪
সেই ঈদের ছুটির দিন থেকে যেখানে রেখে যাওয়া হয়েছিল ঠিক সেখানেই এখনও নিথর হয়ে স্থানে বসে আছে। এর আসলে এভাবেই সৌন্দর্য, আর আমরা ভেবেছিলাম বলে। রাত হয়েছে। এখন ঘুমানোর সময়। তাই থাকুক ওসব যেভাবেই আছে। সকাল হলে দেখে নেওয়া হবে বলে আর কাছে ভিড়তে গিয়েও আর ভিড়া হালো না।
পরের দিন সকাল বেলায় সকল প্রাতঃকর্ম রুটিন মাফিক শেষ করে নেওয়া হলো। শেষে, তাকিয়ে দেখি ঘড়ি কাঁটা বলছে– অফিসে পৌঁছাতে সময়ের টায়টায় হয়ে যাবে। আবার রাস্তায় কোনো কারণে এদিক-সেদিক হয়ে গেলেও দেরি হয়ে যাবে।
ঠিক গোসলে যাওয়ার সময়ও চোখে পড়েছে। গোসল থেকে বের হয়েও বিবর্ণ টব দুইটি চোখে পড়েছে। যখন প্যান্ট ও পাঞ্জাবি পড়া শেষ করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হবো ঠিক তখনও চোখে পড়েছে। মনের ভেতর কেমন যেন এক রকম আফসুস কাজ করছে। টবে থাকা বিবর্ণ গাছের দিকে তাকিয়ে আবারও প্রতিজ্ঞা করা হলো- আজ অফিস থেকে ফিরে এসে অবশ্যই যত্ন নেবো। মনের কোণে একটা ভারি ব্যথা গেঁথে ঘর তালা দিয়ে বের হওয়া হলো। এমন সময় মনে হলো, অফিসে ব্যবহার্য ফোনটি ঘরের ভেতরে রেখেই বের হওয়া হয়েছে। এমনিতেই সময় নেই, তার উপর এমন ভুল!
পৃষ্ঠা-০৫
আবারও ঘরের তালা খুলে ওয়ারড্রবের উপর থেকে ফোন নিতেই পানির বোতলে চোখ পড়ল। এক ঢোক পানির তেষ্টা মেটাতে আবার সোফার বসা হলো । পানি পান করতে গিয়ে আবারও ওই দুটো বিবর্ণ টবের উপর চোখ পড়ে গেল।
এবার কেনো যেনো আর নিজেকে সংবরণ করা গেলো না। পানির বোতলটি হাতে রেখেই উঠে গিয়ে টবের পাশে এসে বসা হলো। তখনও সূর্যের কড়া আলোয় টব দুটোকে তপ্ত করে তুলছে। টবে থাকা গাছের গোড়া পরখ করে দেখে আঁৎকে উঠলাম। দেখি, টবের মাটিতে পানির লেশ মাত্র নেই। শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এ অবস্থা দেখে নিজের প্রতি নিজের ক্ষোভ হলো, আফসোস হলো। মনে হলো, সত্যিই কি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম? সত্যিই কী এতক্ষণ হেলা করা উচিত হয়েছে? তখন হাতে থাকা বোতল থেকে পানি যত্ন করে ঢেলে দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দেওয়া হলো। এবং থেমে থেমে বেশ কয়েক বার দেয়া হলো। টবের মাটি পানি শোষে নেওয়া দেখে মনে হলো যে, প্রাণটা বেঁচে গেল এবার।
পৃষ্ঠা-০৬
ছোটগল্প : এক মুঠো পানি
লেখক : তারিকুজ্জামান তনয়
সময়: মার্চ ২০২৬, শেওড়াপাড়া, ঢাকা।
আরও দেখি- সংগীত
“প্রকৃতপক্ষে, বিরক্তি বা ক্লান্তিবোধ অনেক সময় দায়িত্ব বা কর্তব্যকে হালকা করে তুলে।”
আরও দেখি- কবিতা
“জীবনটা একটা দোদুল্যমান দোলনা—কিছু বিষয় ফিরে আসে, আর কিছু বিষয় চিরতরে হারিয়ে যায়।”
আরও দেখি- ছোটগল্প
“টবের মাটি পানি শোষে নেওয়া দেখে মনে হলো—প্রাণটা যেন বেঁচে গেলো এবার।”
আরও দেখি- আর্ট
-
Facebook |
f : facebook.com/bonopushpa
-
YouTube |
: @tariquzzamantonoy3123
Twitter |
T : @bonopushpa
Website: www.bonopushpa.com