নাজির উদ্দিন কবিতা | তারিকুজ্জামান তনয়

নাজির উদ্দিন

তারিকুজ্জামান তনয়

ছাতুর মিয়ার ঘরে এক প্রভাতে
এক চিৎকারে সূর্য উঠে, আরেক চিৎকারে ডুবে।
অর্থাৎ, ছাতুর মিয়া পুত্র সন্তান লাভ করলেও
তার স্ত্রী পরলোক গমন করেন।
নবজাতক ছেলেটির নাম- করাল।

কিছু লোক পাছে ফিরে বলে-
“এ অপয়া। পৃথিবীতে এসেই মাকে খেল।”

আবার কিছু লোক ছাতুরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে-
“চাঁদের মতন ধবধবে ছেলে পেয়েছ–
এই তো আশীর্বাদ। যার জিনিস সে নিয়েছে,
দুঃখ করিস না। একটা নিকাহ্ করহ আবার।”

ছাতুর কিছুতেই রাজি হলো না আর।
ছাতুর তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন।
হয় না, এমন তো হয়- শুনেছি।
স্ত্রীলোক স্বর্গও বটে আবার নরকও!
ছাতুর হয়তো স্বর্গ পেয়েছিল; তাই-
সেই মর্যাদাকে খাট করতে চায়নি আর।
তাছাড়া করাল- তার স্ত্রীর দেয়া আমানত।
কিছুতেই অযত্ন হোক সে তা চায় না।
একদিকে পেট চালাতে হয়; অন্যদিকে করালের যত্ন।

দুই-একজন আত্মীয় ফয়-ফরমায়েশ করে যান-
কিন্তু ছাতুর তাদেরকে খেতে দিতে পারে না।

পাড়া-পড়শী কিছু হৃদয়বান মহিলারা
যদিও একটু-আঁধটু কাজ করে দিত,
তার অধিক পরিমাণ ছাতুরকে খোঁটা দিয়ে বসত
-‘কি লক্ষ্মীছাড়া হয়েছ। ছেলেটার কি অবহেলা টাই না হয়।
অভিশাপ লাগবে তোর।’

করাল নিজের কপালকে যতটা না অভিশাপ দেয়
তার অধিক আওড়ায় তার পড়শী।
ছাতুর বিরক্ত হয় বটে, আবার হাসেও।
প্রয়োজন, তবুও সে কিছুতেই নিকাহ্ করবে না
-এই প্রতিজ্ঞা তার।

ছেলের স্যাতস্যাতে সর্দি, দুর্গন্ধ মল,
এসবে তার ঘীণ ধরে শরীর ফুলে ওঠে, তবুও–
এসবই হয়েছে নিত্য সম্বল।

একদিন,
করালকে শুইয়ে রেখে গিয়েছে দোকানে।
ছাতুর রসিক লোক, সেখানে পেয়েছে পুরাতন বন্ধুকে।
বন্ধুটি খোঁচা দিয়ে বলে-
“বিবাহিত লোকের স্ত্রী’হীন হলে- ক্ষেপাটে বাঘ তার কাছে হার মেনে যায়।”
ছাতুর হেসে কুটিকুটি- “রাখ মিয়া! কি লজ্জা দিলে।”

এদিক-ওদিক কথা বলতে হলো কিছু দেরি,
কি সর্বনাশ! বিছানার পরে মল-মূত্র ছড়িয়ে করাল করছে গড়াগড়ি।
ছাতুরের প্রচণ্ড রাগ পায়- “ধরে দিব আছাড়।”
পরক্ষণেই ভাবে এতো অবুঝ শিশু, ফেরেশতা।
শান্ত হয়ে নিজেকে বোঝায়– এ অদৃষ্টের পরিহাস।

করালের বয়স পাঁচ।
খেতে চায় না কিছুই। বাঁদর হয়েছে একটা। কী যন্ত্রণা আবার।
বাড়িময় ঘুরে শুধুশুধু, তবুও খেতে চায় না।
কি লক্ষ্মীছাড়া ছেলে-রে বাপরে বাপ!
অবুঝ ছিল যখন- বুঝতো না, তাই খেতো না।
এখন বুঝে, তবুও খেতে চায় না।
“আর কোন কাজ নেই-রে আমার”- এই বলে ছাতুর চিৎকার করে মরে।
মাঝেমধ্যেই দু-চারখানা ঝাড়ে পিঠের পরে!

বয়স যখন বারো-
ছাতুরের বয়স পেকেছে। অন্যদিকে করাল ডানপিটে হচ্ছে।
কনকনে শীতে মজা পুকুরে ঝুপঝাপ দেয় ডুব।
শেওলা জমে কখনও চুলের পরে কখনও গায়ে;
সেই শেওলা শুঁকে চামড়া টেনে বিবর্ণ হয়ে ওঠে।

করালের হাতে-পায়ে রয়েছে যেন চুম্বক;
যেখানেই অলক্ষ্মী সেখানেই তার কাজ।

এই ধরুন-
জামা পড়তে যাবে- হাত থেকে পড়ে ময়লা লেগে যাবে।
গ্লাসে পানি ভরতে গিয়ে পানি ঢেলে দিবে।
কাউকে আদর করে ডাকলেও সে ক্ষেপা যাবে।

কয়েকদিন আগে ঘটনা–
পড়শী এক চাচা তার গরু মরে গিয়েছে;
তাকে এমনভাবে সান্ত্বনা দিল যেন তার আমোদ লেগেছে।

কম-বেশি সবাই ফল চুরি করে খায়।
করাল যেই না গাছে ওঠে, ঠিক অমনি-
হয় ডাল ভেঙে পড়ে, না হয় ফলটি হাত থেকে ফসকে যায়।
তার বাঁদরামির অন্ত নাই। অবশ্য তার বাঁদরামির কারণ-
‘তার মনও রয়েছে আবার ইন্দ্রিয়ও রয়েছে।’

একদিন সদর রাস্তার উপর
কলাগাছের খোলস দিয়ে গর্ত ঢেকে দেয়।
পাশেই ছিল কাঁঠাল গাছ,
তার মগ ডালে বসে সে মুখ টিপ্পুনি হাসিতে হাসতে থাকে।
এমন সময় এক ভদ্রগোছের ভিন গাঁয়ের লোক
সাইকেল হাঁকিয়ে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছিলেন।
ঠিক কী আচানক ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে-
এটা ভেবে করালের আর দেরির তর সইলো না।
তাই সে মগ ডাল বসেই বিদীর্ণ হাসিতে ফেটে পড়ল।

ভদ্র লোকটি গাছের উপর দিকে তাকাতেই সাইকেল গেল গর্তে পড়ে।
আর সেই হ্যাঁচকা ঝাঁকুনি খেয়ে ভদ্র লোকটি পড়ল দুহাতে তফাতে।
হাতের তালু, কনুই, হাঁটুতে ছাল উঠে গেল তাতে;
আর মুখমণ্ডল ধুলোয় হল বিবর্ণ।

এই দেখে করালের দুঃখ হলো বটে’ তবুও
তার পেট ভরা হাসির রেখা ফুটে উঠল মুখে অনায়াসে।

আট-দশ জন জড়ো হলো;
আবেগ সামলাতে না পেরে একজন মুরুব্বি-
‘কষে দুই-তিনটি খানা থাপ্পর বসিয়ে দিলেন গালের পরে।’

অল্প আঘাতেও যে কেঁদে ফেলে সারা; সেই করাল–
ক্ষণিক বিষণ্নতার পর দু’পা পিছিয়েই
পেট মুচরে হাসির পড়ল ফেটে।

ছাতুর উদ্বিগ্ন।
অবশেষে করালকে নিয়ে গেল এক কবিরাজের কাছে।
কবিরাজ মশাই- হা, হুম, হ্যাঁ বলে সব ঘটনা শুনে;
-“এসো আগামীকাল প্রভাতে পঞ্চাশ টাকা লয়ে।”

প্রভাতেই এলো ওরা- দেখে কবিরাজ আছেন আসনে বসে।
বিজ্ঞের মতো চেয়ে বললেন- “তোরই তো ছেলে, হুম?
কি ভুলটাই করেছিস করাল নামটি রেখে!
আজ থেকে নাম তার নাজির উদ্দিন।
এই দাওয়াই রইলো– আগামী বছর তিন।
কবিরাজ আর দিলো না কোনো তাবিজ।

ছাতুর মনঃক্ষুণ্ন হলো। তবুও–
কবিরাজের দাওয়াই,
কষ্ট হলেও মেনে নিল নাম নাজির উদ্দিন।

কী নাম, কে রাখল, তাতে কী বা আসে যায়?
এত শুধুই পরিচয়, আর তো কিছু নয়?
তবুও যে আছে কিঞ্চিৎ রেশ মনের মুখের মুখে,
ফুলের সৌন্দর্য ফুলের নামে লেপে।

শেষে নামের দাওয়াই,
প্রকাশিল বড় কসরত ও মহিমা;
পরশ লাগল যাপিত জীবনের দামে,
করাল হলো উঠলো নাজির উদ্দিন,
জীবন রচিত হলো– স্বাদ-রস-সম্মানে।

রচনার স্থান– ময়মনসিংহ
রচনাকাল– ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

—**—

আরও পড়ুন

🌺 আরও দেখি — ছোটগল্প
🌺 আরও দেখি — কবিতা
🌺 আরও দেখি — আর্ট
🌺 আরও দেখি — উপন্যাস


“শেষে নামের দাওয়াই,
প্রকাশিল বড় কসরত ও মহিমা;
পরশ লাগল যাপিত জীবনের দামে,
করাল হলো উঠলো নাজির উদ্দিন,
জীবন রচিত হলো– স্বাদ-রস-সম্মানে।”


বুনোপুষ্পের সঙ্গে যুক্ত থাকুন


📌 সাহিত্য সুখী করে।

0 0 votes
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted