আমি তাকে কিছুই বলিনি
আমি তাকে কিছুই বলিনি 🔶🔶🔶
দু’মাইলের পথ হবে হয়তো। সময়ের দিক দিয়ে হিসেব করতে গেলে দেখা যায় এক ঘণ্টা। আমি তাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করিনি। এমনকি জিজ্ঞেস করার প্রয়াস বোধ করিনি। তবুও সময়টা যেন মিনিট দশেকেই ফুরিয়ে গেল- এমন মনে হল।
ছোটবেলায় কবিতা বইতে পালকি দেখেছিলাম। এরপর জাদুঘরে। তখনও ছোট্ট প্রাণের মাঝে কথা ভেসে উঠত- না জানি কত না আনন্দে বউকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যেত। আমিও যদি যেতে পারতাম। এখনও মাঝে মধ্যে মনে হয় যদি পারতাম! লোক সকল হৈ-হুল্লোড় ধ্বনি দিয়ে দিয়ে নিয়ে যেত, আর আমি নানান স্বপ্ন বুনে বুনে শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। আজ এ দীর্ঘ পথের মাঝে আমাদের আর কোনো কথা হল না বটে কিন্তু, জন্মের আনন্দ বোধ হল, ঠিক ঐ পালকিতে ওঠার স্বপ্নের মতোই যেন।
পাশাপাশি হেঁটে চলতে গিয়ে আমি হোঁচট খেয়ে প্রায় পড়ে যাই পড়ে যাই এমন। তখন সে আমার হাত চেপে ধরে রক্ষা করে নিল। মুচকি হেসে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হল বটে কিন্তু, কথা বল হল না আর। যদি কোনো উপলক্ষ পাওয়া যায়-ই তবে তা কাজে লাগাতে হবে এমন কোনো কথা নেই তো! এমনও হতে পারে, জমে রাখা সুযোগ পরবর্তীতে দ্বিগুণ মাত্রায় ফিরে আসতে পারে। আবার নাও ফিরে আসতে পারে। আশা রাখতে মন্দ কি! এমনও তো হতে পারে, তা শাস্তি হিসেবে ফিরে আসে। যত সুখের ভেলকি অথবা দুঃখের ভেলকি সামনে এসে প্রাণ চঞ্চল করে তুলোক না কেন, আমি তার সাথে কোনো ভাবেই কোনো কথা বলব না।
পৃষ্টা-০১
আমার মাথার উপর ছেয়ে আছে এক বিশাল আকাশ। আমি যখনই মাথা উঁচিয়ে ঐ আকাশটার দিকে তাকাই তখন আমার হৃদয় শূন্য হয়ে যায়। বুকটা হালকা মনে হয়। এই একটু আগেই আমার অন্তর জুড়ে অনেক কথা নকশি কাঁথার মতো বুনন করতে ছিল। হরেক রঙে, হরেক আল্পনাতে অনুভূতিগুলো চিত্রিত হতে চেয়েছিল। তাতে, রক্ত ঢেলে দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে চেয়েছিল।
মুক্ত হাওয়ায় যখন কেউ ঘুরে বেড়ায় তখন তার প্রাণস্পন্দনগুলো অনেক বড় হয়ে ব্যক্তিকে বিশাল করে তুলে। সেখানেও বুকের পাঁজর চুইয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো ব্যক্তিকে ছোট করে তুলে আবার। রক্তগুলো কখনো জমাট বাঁধে, আবার কখনো তীব্র স্রোতের মতো বয়ে গিয়ে বেহুঁশ করে তুলে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি ফতুর হয়ে যাচ্ছিলাম কেবলই। পেছনের সব দুঃখ মাখা স্মৃতিগুলো ভুলে যাচ্ছিলাম প্রতিটি সময়েই। সেই আনন্দের সংবাদটুকু প্রস্ফুটিত হাসির ছটা আমাকে বড্ড বেশি ক্লান্ত করে তুলছে, তবুও তাকে কিছুই বলিনি। আমি তাকে কিছুই বলিনি। পথ ধরে পাশাপাশি শুধুই হেঁটে চলছি মাত্র।
একবার ধপ করে ঘাসের উপর বসে পড়লাম। ও চেয়ে দেখল। এবং থেমেও গেল। এমনকি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি ফিরে চেয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখে কোনো কথা ছিল না। ছিল শুধু অতটুকু-ই হাসি। সাদা সাদা দাঁত। বাম গালের কোণে ছোট্ট একটি টুল পড়েছে। ওর একটু নিচে স্পষ্ট একটা ভাঁজ জমেছে। এমনিতেই সে পছন্দের মানুষ। তার উপর মুখের অমন কারুকার্যতা। আমার চোখ ঝলকিয়ে উঠছে! অন্তর আত্মা থেকে জল ফিনকি দিয়ে ঠেলে বেরোতে চায় কেবলই।
আবৃতি : শেষ মিনতি বাই আশুরা 🔴
ঘাসগুলো মাটির বুকের উপর বিছিয়ে থাকলেও ওর উপর কোনো ধুলো জমা ছিল না। ঘাসগুলো আমার পা যুগল চুম্বন করে এক শীতল উন্মাদনা ছড়াল। সে বুঝতে পেল, আমি উতল হয়ে উঠছি। তবুও সে কিছুই বলল না।
পৃষ্টা-০২
আমি বরং আমাকে নিশ্চুপ করে নিলাম। কি বুঝে নিলাম তা জানি না! আমি অনেক গম্ভীর ছিলাম। ওর গায়ের ছায়া আমার উপর এসে পড়ল। ছায়াটা অনেকক্ষণ স্থির রইলো। সে ছায়াটুকু বড় আদরের ছিল। সমর্পণটুকু বুক কামড়ে ওঠা জলের ললিত রস মেশানো ছিল।
আমার যতটা অভিমান জমে ওঠেছিল তা আমি কেমন করে যেন ভুলে গেলাম। কচি ঘাস আমাকে কি যেন বলতে চাইছে। অবশ্য আমিও তাকে কিছু বলতে চাই বলে মনের মাঝে ঐ এক রকম বায়ু বেড়ে গেল। মনে মনে ঘাসকে একটা কবিতা আওড়ে দিলাম-
“ফুল ফুটল, সুবাস ছড়াল বনে বনে,
প্রজাপতি উড়ে গেল, মাছিদের গুঞ্জনে।
মোর তান, মোর ঘ্রাণ, ধ্যানের চূড়ার কলি-
ক্ষণে ক্ষণে ফুটে ওঠে উচ্ছল সুপ্ত মণি!
তারে বাঁধিতে চাই বকুল মালায় সুতোয়,
দূরের সুখ কাছে এসে কেবল দুমড়োয়, মুচড়োয়– শুধু!”
না না, তবুও তার সাথে কথা বলিনি। আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল অবলীলায় ঝরে পড়ে ঘাসের তলে লুকালো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছুটে বেরিয়ে গেল ফুসফুস থেকে।
আবার সেখান থেকে উঠে গিয়ে দুজনে হেঁটে হেঁটে সামনে এগিয়ে চললাম।
পাশে থাকা সঙ্গী যদি মনের মতো হয় তবে, সে পথচলা কত না আনন্দের হয়ে থাকে; তার উপর সে আমার স্বামী। শুধু স্বামীই নয় সে আমার প্রিয় বন্ধু। আমার প্রতি তার বৈবাহিক অধিকার আছে যতটুকু, ঠিক তার ঢের বেশি মায়ার দখল।
তোমরা সবাই তোমাদের স্বামী ঘরে এলে তাকে স্বামী বলে সম্বোধন করো। আদর-যত্ন নাও। আমিও নেই। তবে আমি তোমাদের মতো করে নেই না।
ওর সামনে যেতেই আমার হাত ধরে টান দিয়ে কাছে ডেকে নেয়। আমার মুখের হাসিতে পূর্ণসুখ আছে কি না, তা সে পরখ করে দেখে। এমন দু’টো কথা তাকে শুনাতে হয় যেন তার পরাণ জুড়ায়। তারপর চোখে চোখ রেখে একটু জিরিয়ে নিতে হয়। এমন নানান অলিখিত শর্ত থাকে, যা সময়ের পর সময় ধরে দিনের পর দিন ধরে প্রাত্যহিক রীতিতে পরিণত হয়ে আছে আমাদের ঘরে।
পৃষ্টা-০৩
মানুষের মন আছে। আর এই মন পরিবেশ পরিস্থিতি দ্বারা তরঙ্গিত ত(ঢেউ) হয়। মানুষ বড় অসহায়। মানুষের চলার শক্তি হল তার মন। মন সব সময় একটা অন্ধকারের মাঝে উবু হয়ে থাকে। বিবেকের সামান্য আলো কখনো কখনো সঠিক পথ/প্রমাণ খুঁজে পায়। আবার কেউ খুঁজেই পায় না। মানুষ তার অনুভূতির কতটুকুই প্রকাশ করতে পারে– বল?
এমন নানান অসঙ্গতি ও সংগতি আমার জীবনভর ফুল হয়ে ফোটে আছে। তোমরা সবাই জানো, একটা ফুলের সবগুলো পাপড়িই সমান হয় না। পাপড়িগুলো নানান আকৃতির হয়ে থাকে। এমনই কত শত ছোট-বড় নানান ঘটনা দিয়ে আমার জীবন পূর্ণ।
সেবার আমার জ্বর এলো। এমন কাঁপুনি দেওয়া জ্বর এর আগে কখনো আসেনি। সেদিন জান-কবজের ফেরেশতা যেন মধ্য আকাশ পর্যন্ত চলে এসেছিল। স্বামীর সেবা-শুশ্রূষায় সেই ফেরেশতাকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আমি এটা জানি, হায়াত থাকলে কেউ মরে না। তবুও স্বামীর সেদিনের সেই শুশ্রূষার প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা ফিরে ফিরে মনে পড়ে।
সারারাত জেগে মাথায় পানি দিয়েছে। কপালে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। শরীর মুছে দিয়েছে। ঠান্ডা জল পান করতে দিয়েছে। মাথার এলোমেলো চুলগুলো চিরুণির আঁচড়ে তরুণ করে তুলেছে। সে রাতে আমি যেন আগের চেয়েও আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলাম। তোমরা আমাকে যদি বল- তাহলে বলব আমি আবার সে সময়ের মতো অসুস্থ হতে রাজি আছি।
পৃষ্টা-০৪
আমি পানি খেতে গিয়ে বিছানার উপড় পানি ফেলে দিই। কিছুটা ইচ্ছাকৃত ছিল। মানুষ টা একবারের জন্যও বিরক্ত হল না। বরং হাসি মুখে আমাকেই সামলালো।
তখন আমি বললাম, তুমি কেমন পুরুষ গো, মোটের উপর একটু রাগও করো না?
ও হাসলো।
-বেশি করো না গো! শেষমেষ আলসেমি করতে মন চাইবে। স্ত্রী লোক আয়েশ চায়।
ও বলল- “তুমি শুধু স্ত্রী নও, বন্ধুও বটে।”
-তাই?
-“হুম! আমার বিপদে তুমিও….”
আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম।
-এমন অলক্ষুণে কথা আর কখনো বলো না। এমন কথাগুলো আমার সুখের উদ্বেলের চেয়ে ভীতি ছড়ায় বেশি।
চোখ থেকে জল অযথাই বের হয়ে এলো। ও মুছে দিলো। প্রেম থেকে হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয় বুঝি। পুরুষের বুক মরু। অথচ সেই পুরুষের হৃদয়ই প্রেমের সৌরভে কত কোমল।
আবৃতি : সে কখনো বলেনি বাই আশুরা 🔴🔴
আমাদের মাঝে আমাদেরই কিছু কথা প্রেমরসে পরিপূর্ণ; অথচ তা আর কেউ-ই জানে না। তবে আমার কিছু কথা ওর মুখ ফসকে গিয়ে বাহির দরবারে আলাপের মাঝে ঘি ঢেলে দিয়েছে। কি আর করার, আমাকে বেঁচে সবাই আনন্দের খোরাক ঝুলিতে ভরে নিয়েছে। তখন আমি লাজে মরলেও কেউ আমাকে ছেড়ে দেয়নি। অনেক দিন হয়েছে, আমিও এর আনন্দের ভাগ মনে মনে লুফে নিয়েছি, তা আর কেউ জানে না।
আমি তখন জানতাম না হোঁদল শব্দের অর্থ কি। সে অনেক ফর্সা, স্বাভাবিক স্বাস্থ্য, আর রসিক বলে আমি তাকে আদর করে মাঝে মধ্যেই হোঁদল বলে ডাকতাম। যদিও এর অর্থ ঠিকঠাক মতো জানতাম না। সে কিন্তু দেখতে তেমনই। এর অর্থ জেনেও আমাকে কখনো বলেনি। শুধু হাসতো। আমি কি আর জানি- এতো কিছু!
সে আমাকে শিমুল বলে ডাকতো। বিয়ের প্রথম বছর। বৈশাখ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমার শ্বশুর বাড়ির দক্ষিণ পাশে রাস্তার উপর এক মস্ত বড় শিমুল গাছ ছিল। সকাল বেলাতে গিয়ে দেখি বেশকিছু শিমুল ফুল তার তলে ঝড়ে পড়ে আছে। লোভ হল। শখ হল স্বামীর শয়ন অবস্থায় বুকের বাম পাশে সাজিয়ে দিতে।
যা ভাবা তাই হল। একটা একটা করে শিমুল ফুল সাজিয়ে দিতেই সে জেগে উঠলো। খপ্ করে আমার হাত ধরে বসলো। তখন আমার আর যেন লাজের শেষ রইলো না। আমার এমন বোধ জাগবে তা আগে যদি জানতাম, তাহলে এমন ঘটনা আর ঘটাতাম না। পরে, সে রস রসিক না হয়ে কাঁটা উঠলো যেন।
পৃষ্টা-০৫
সে আমার এ লাজের মাঝেই যেন আনন্দের খোরাক খুঁজে পেল। আমার লাজ যত বাড়ে তার ভণিতা তত বাড়ে। এক পর্যায়ে বিপত্তি বাঁধল। আমি আর আমার চোখের জল বেঁধে রাখতে পারলাম না। দুই হাতের তলে মুখ লুকিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কান্নার আওয়াজগুলো বাঁধন হতে লাগলো ক্রমে ক্রমেই।
ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো তখন। আমাকে সামলাতে নানান কথা আর ভণিতা করতে লাগলো। ওর এমন কারুবারু দেখে আমার হৃদয় সুখে ভরে উঠলো। কিন্তু চোখের অশ্রু যেন কিছুতেই কোনো সায় মানছে না। কেবল অঝর ধারায় ঝরে পড়ছে তো পড়ছেই।
এক পর্যায়ে ও মনে মনে খুব অনুশোচনায় ভুগছিল। আমি এ অবস্থা বুঝেও নিজেকে সংবরণ করতে পারছিলাম না। শেষে ওর বুকে লুকিয়ে বললাম- আমার কি দোষ! লাজ থেকে উছলিয়ে পড়া চোখের জল সুখের সাথে মিশে এখন বাঁধন ছাড়া হয়ে পড়েছে। তুমি কেনো বুঝো না যে, তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই, ক্ষোভ নেই।
এরপর ওর মুখটা যেন মেঘের ঘোমটা ছেড়ে রাতের আকাশে ওই চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
বলল- “আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।”
-“আমিও।”
নীরব রইলাম দুজনেই। তখন আমার চোখের জল অনেকটা থেমে গিয়ে নীরব হয়ে ওঠেছে। ভাবনার কোনো জটিলতা ছিল না, তবুও চোখ ঘিরে আসা নীরবতা দু’জনার মাঝে বিরাজ করলো অনেক সময় ধরে।
তখন, ও বলো- “আমাদের ছেলে হলে- কী নাম রাখবে?”
-জানি না।
-“একটা বলো?”
-নিমপাতা।
-“কিহ! এটা কোনো নাম হল?”
-তুমিই তো বললে যে কোনো একটা নাম রাখতে।
-“মেয়ে হলে আমি নাম রাখবো।”
-কেন? মেয়ে কি শুধু তোমার?
-“তা নয়। তবে রাখতে ইচ্ছে করে। মেয়ে বাবুদের পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখা যায়।”
-পুতুল রাখবে?
-“নাহ! বলেছি তো তুমি নাম রাখবে না। আমি রাখবো।”
-মেনে নিলাম। তা কী নাম রাখবে?
-“সে বলা যাবে না।”
-কেন?
-“আদুরে নাম প্রকাশ করতে নেই।”
-তাই?
-“হুম।”
-আচ্ছা; অপেক্ষায় রইলাম।
-“আজ থেকে তোমাকে একটা নাম দিবো।”
– কী নাম?
-“শিমুল। তুমি আমার বসন্ত রানী।”
-কেঁদে দেবো কিন্তু।
-“না, লক্ষীটি।”
পৃষ্টা-০৬
মেয়েরা যদি না বলে, তবে হ্যাঁ হয়ে যায়- সেদিন প্রমাণ পেলাম। শিমুল নামটি ঘর ছেড়ে বাইরে চলে এলো। এক পর্যায়ে এ নামটি বদনামে রোদের আলো তপ্ত হয়ে উঠলেও শরীরে সয়ে গেল।
সকল স্মৃতিগুলো হৃদয়ের কোণ জুড়ে তরঙ্গ হয়ে থেকে যায়। আবার তা জমে থাকে সময় মতো জ্বলে ওঠার জন্য। স্মৃতিকে ফেলে দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেই বরং তা তেঁতু হয়ে সামনে চলে আসে। স্মৃতিকে পোষ মানিয়ে রাখতে হয়। যেন কোনো সময় উঁকি দিলেও পোষ মেনে থাকে। লক্ষ্মিটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকে।
আবার দুজনে এগিয়ে চললাম পথকে পেছনে ফেলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে এক আনন্দ খেলা দেখা গেল। সূর্য তার আপন মহিমায় আলো ছড়িয়েছে। মেঘ তার নিরুপায় দেহ নিয়ে বাতাসের ভেলায় ভেসে ভেসে সূর্যের সামনে এসে আবার সরে গিয়ে অজানার গন্তব্যের দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে চলছে। তবুও আলো, তীরের ফলার মতো তীর্যক হয়ে মেঘ ঠেকরিয়ে বের হয়ে আসছে। আবার কোনো ঘন কালো মেঘ শক্ত হয়ে আলোকে সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে দিচ্ছে। এ খেলা কেবলই আমার ভালো লাগে। এ কেবল স্বপ্নময় লুকোচুরি লুকোচুরি খেলা-
‘ওই দানা বাঁধা শক্ত কালো- ফেলো আঁড়াল করে;
সুখ, তায় দেয় আড়ি পেখম মেলে মেলে।
কোল ছাড়া ফুল দুঃখে আকুল,
দম ছাড়া ভুঁ আঁড়ি আঁড়ি-
রঙ এর মেলায় তা চেনা ভারি।
সবই যেন আপন আপন লীলা ভ্রম,
আমি যেন আমার মতন তাতেই মেলি– সম্মুহ।’
তবুও তাকে হৃদয় উঙলে উঠা কথাগুলো বলব না। বরং আমি আমার মতন রঙ দিয়ে তাকে ভালোবেসে যাব। আমার যে অনুভূতিগুলো তার কাছে অচেনা তা তাকে বলব না। তাকে কিছুতেই আমার আকাশের রঙ চেনাবো না।
আমি তাকে কোনো প্রকার পূর্বাভাস না দিয়ে এক প্রকাণ্ড জাম গাছের পাশে ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে পড়লাম। আকাশটা আমাকে খুব ডাকছে। আমার মনকে বারবার বিচলিত করে তুলছে যেন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে যাই। আমি মনকে ছেড়ে দিলাম। এমন সময় সেও আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার সাথে সেও আকাশের দিকে তাকালো। আমার মতোই সে অনেক সময় ধরে তাকিয়ে রইল।
সে বলল আমাকে ঐ মেঘের কাছে নিয়ে যেতে চায়। আমাকে সেখানে রানী করে রাখবে। আর কেউ থাকবে না। ও রাজা আর আমি রানী। সেখানে একটা ফুলের বাগান গড়ে দেবে। তাতে একই সাথে হরেক রঙের ফুল থাকবে (লাল, নীল, সাদা, কালো, বেগুনি, আসমানী সহ আরও হরেক রকমের…)। বাগানের একপাশে টায় ঝর্ণা থাকবে। নানান প্রজাতির পাখিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেখানে তারা নানান ক্রীড়ায় মেতে থাকবে। আমাদের প্রমোদের জন্য একটা পাঁচীল ঘেরা দীঘি থাকবে। মার্বেল পাথরের ঘাট থাকবে। প্রাণের সমস্ত রঙ তরতর করে জেগে তুলার জন্য সেতারার আওয়াজ বেজে উঠবে। এক ধরণের সুরা থাকবে, যা খেলে আমরা আরেক স্বর্গ রাজ্যে পৌঁছে যাবো। সেখানে আমরা দুজনে শিশুটি হয়ে রব। সারাদিনময় ঘুরে-খেলে-মনের সুখে গাইবো, নাচবো। সেখানে কোনো ক্লান্তিই ছুঁবে না। সেখানে রবে শুধুই আলো আর আলো। আমরা যখন দুজনে দু’জনার দিকে তাকাবো তখন আমরা পরীর সাজে সেজে উঠবো বারংবার নবনূতন করে।
অথচ তার প্রত্যেক কথাগুলোই, প্রত্যেক স্বপ্নগুলোই আমার প্রাণে দোলা দিয়ে গেল। আমিও একান্তে ঠিক তাই তাই চাই। মনে হল আমি এখুনি তার বাহুতে ধরা দিই। কিন্তু আমি ধরা দেবো না। কোনো কথা বলিনি– তবুও। সে তাকিয়েছিল ঐ দু’চোখে সমুদ্রের তৃষ্ণা নিয়ে। আমার মনে হল, এ দুর্দশা থেকে তাকে বাঁচাতে হবে। মন আমার বাঁধন ছাড়া হয়ে উঠলেও শক্ত হাতে নিজেকে সংবরণ করে নিলাম। তবুও বলব না। একটি কথাও বলিনি তাকে। বলব-ও না- কখনো।
পৃষ্টা-০৭
পথ ফুরিয়ে এলেও কথা বুঝি ফুরায় না। কথা যে অনুভূতি নামক দোলক, যা চেতনার ব্যথাগাঁথার সাথে মিশে মিশে বেগবান হয়ে ওঠে।
পথের ওপাশের গন্তব্য যেখানে, সেখানে আমরা দুজনেই থেকে যাবো আজীবন। এ মোর হাজার-হাজার কোটি প্রার্থনা বিধাতার দরবারে। হয়তো তিনি কবুল করেছেন, হয়তো না। তবুও প্রার্থনাটুকু বারংবার লাগাতার হয়ে ফিকে হয়ে উঠুক বারেবার।
ধন্য করেছো মোরে- শুনিয়ে বিমুগ্ধ সুর।
চৈতন্য ফুটে ওঠেছে খই হয়ে, হাসি হয়ে;
রঙে রঙ মেখে,
ফের এই পাওয়া- কেবলই ফানুস আর ফানুস।
ফুল চায় মালা হতে, শোভা পেতে চায় গলায়;
তাই হল তাই হল।
সুতাটাই রয়ে গেল শুধু-
ঝিনুক আঁচড়ে মরমড়ে,
স্মৃতিটুকুই শুধু আলো ছড়ায়।
পথের ঘাস মরে গিয়েও আবার সজীব হয়ে আপন মহিমায় ফিরে আসে। আবার কচি/তরুণ হয়ে ওঠে। এ পথের সাময়িক সমাপ্তি হলেও পথ হারিয়ে যাবে না। কিন্তু মানুষ! আমার স্বামী! সে আমৃত্যু এমনকি পরজীবনেও ফুল হয়ে ফুটে থাকুক আবার প্রাণের আঙ্গিনা জুড়ে। সে আমার পবিত্র মনীষী। তবুও আর কখনো আমাদের মাঝে কথা হবে না।
পৃষ্টা-০৮
আমি তাকে কিছুই বলিনি
তারিকুজ্জামান তনয়
মার্চ ২০২৩, ঢাকা।
তুমি পড়ে দেখতে পারো আরও কিছু গল্প 🌸🌸
পোষা ছাগল – গল্প
গোলাপ ফুলের কথা
এহসান মামা
দৌবযোগ
কবিতার মডিউল 🌹✦🌹
2024
2023
2025
2018
কিছু আর্ট 🎨🎨🎨
ওপারের ফুল
নির্মল
মনোরঙ্গ
লোক সকল হৈ-হুল্লোড় ধ্বনি দিয়ে দিয়ে নিয়ে যেত,
আর আমি নানান স্বপ্ন বুনে বুনে শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে যেতাম।
যদি কোনো উপলক্ষ পাওয়া যায়-ই তবে তা কাজে লাগাতে হবে এমন কোনো কথা নেই তো!
এমনও হতে পারে, জমে রাখা সুযোগ পরবর্তীতে দ্বিগুণ মাত্রায় ফিরে আসতে পারে।
মুক্ত হাওয়ায় যখন কেউ ঘুরে বেড়ায় তখন তার প্রাণস্পন্দনগুলো অনেক বড় হয়ে ব্যক্তিকে বিশাল করে তুলে।
-
Facebook | 🔵 f : facebook.com/bonopushpa
-
YouTube | 🔴 ▶ : @tariquzzamantonoy3123
- 🐦 Twitter | 🔵 T : @bonopushpa
- 🌐 Website: www.bonopushpa.com