চিঠি — পত্র উপন্যাস
চিঠি — তারিকুজ্জামান তনয়
দুজনের মধ্যে বেশ ভাব জমে ওঠে। অলক একদিন অতি আবেগে আপ্লুত হয়ে একটা ভুল করে বসে। এতে করে সন্ধি কিছুটা বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়লেও সন্ধির যারা শুভাকাঙ্ক্ষী তারা ক্রোধে ফেটে পড়েন। সন্ধির উপর নেমে আসে বহু নিষেধাজ্ঞার দেওয়াল। নানার বাড়িতে সন্ধির বেড়ে ওঠা। এ ঘটনার পর সন্ধিকে তার নানুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তখন অলক অবশ্য যে কাজটি করেছে তা তার অধিকার বলে মনে করেই করেছে। পরবর্তীতে সে বুঝতে পারেছে, এ কাজটি তার ভারি অন্যায় হয়েছে।
গাছের পাখি যেমন সঙ্গিনী ছাড়া ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এধার-ওধার ঘুরে বেড়ায় আর শিস দিতে থাকে, ঠিক একই রকম অবস্থা দাঁড়াল— অলকের। পাকা ধানে মই দেওয়ার মতো অবস্থা তার। এই যে বিশাল আকাশ, এই বাতাস, আলো-আঁধার, পরিচিত জনের কথা সব তার কাছে একসময় কবিতার মতো মনে হলেও, আজ সেসব তার কাছে কাঁটার মতো মনে হয়। কোথাও যেন তার শান্তি নেই আর।
একপর্যায়ে অলক সন্ধিকে নিজের আকুতি, মনঃকষ্ট নকশিকাঁথার ফোঁড়ের মত চিঠির প্রতিটি বর্ণে, শব্দে, লাইনে ব্যাকুলতা গেঁথে পাঠাল। অলকের উদ্দেশ্য হল সন্ধি বুঝুক— তাকে নিয়ে সে কতটা স্বপ্ন দেখে, রং মাখে। সে তার হৃদয়ে কতটা কান্না জমিয়ে রেখে। এই প্রার্থনা, দেবী, সৎ— সন্ধি সবই বুঝুক।
পৃথিবীর বুকে সূর্য কেন উঠে? দিনের প্রতি প্রেম নিয়ে নাকি নিয়তির পরিণতি? আশ্চর্যের বিষয় হল— এ দুটোই স্বর্গীয় ব্যাপার। তবে ভালোবাসা কী? অলক ও সন্ধির মাঝে প্রেম ধরা দিয়েছে, আজ তাদের মন দোলে একই সুতায়। ঢিলা দেওয়া সুতায় যেমন কোনো কিছু শক্ত করে বাধা পারে না, ঠিক তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রেও মান-অভিমান, যন্ত্রণা, অপমান না থাকলে সে প্রেম পোক্ত হয় না। ভালোবাসার ক্ষেত্রে স্বপ্ন বা আশা হল একমাত্র সুতা, যার প্রভাবে প্রেমিক-প্রেমিকার জীবন নাশ করে দিতেও কার্পণ্য করে না। তারা কখনোই সেই প্রেমের রশি ছিঁড়ে ফেলে না। এ সুতা শক্ত করে ধরে রাখার জন্য কিছু ধোঁয়া বের হয়; আর এই ধোঁয়া/বোধটাই হল তাদের কান্নার ভাষা, আকুতির ভাষা, জল্পনা-কল্পনার ভাষা।
উল্লেখ্য, প্রেম হবার মুহূর্তে পরস্পরের সৌন্দর্য যতটা প্রকটভাবে ধরা পড়ে, কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলে তা কেবলই ক্ষীণ হয়ে ওঠে। তখন সর্বময় ভালো লাগাগুলো মনে-প্রাণে-রক্তে মৌলিক দাবি হিসেবে বাসা বাঁধে। অলক আর সন্ধির মধ্যে এমন ছিল। বেশির ভাগ মানুষ বলত— ‘অলকের জন্য সন্ধি; আর সন্ধির জন্য অলক পৃথিবীতে এসেছে। এরূপ আশ্চর্য রকম মিল দেখে অনেকেই তাদের ভাই-বোন বলে ভুল করে বসত। তারা উভয়েই সুন্দর ও বন্ধুসুলভ মনের অধিকারী ছিল।
সেখানেই পড়েছে ছেঁদ। তারা আজ দুই জন দুই দেশের বাসিন্দা। এ দূরত্ব তাদেরকে বড় ক্লান্ত করে তুলছে। আজ তারা তিক্ত ঘামে বিষাদগস্ত। তারা আজ যতটা না প্রেমের গুঞ্জনে বিনয়ী হয়ে ওঠে, তার চেয়ে ঢের বেশি রাগ-ক্ষোভ-সম্মানের দেয়ালের আঁড়ালে কাতরিয়ে মরে। তাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া স্মৃতিগুলো মাঝে মধ্যেই দমকা হাওয়ার মতো বেসামাল করে তুলে। তাই অলক একাধারে প্রেম-বেদনার রসে অশ্রুশিক্ত হয়ে পড়েছে। তবুও তাকে সকল কাতরতা সামাল দিয়ে এগিয়ে চলতে হয়। অবশেষে অলক তার সন্ধিকে আবেগের নির্যাস ঢেলে দিয়ে একটি চিঠি লেখে—
অলক সন্ধিকে তার আকুতি প্রকাশ করে—
আমার প্রজাপতি,
ওই দেখো আকাশে ময়ূরের দল উড়ে যাচ্ছে।
ওদের কোনো একটা ফাঁকে যদি
আমরাও সঙ্গী হতাম।
তখন যদি কালনাগিনী মেঘ থেকে—
বৃষ্টি এসে আমাদের ভিজে দিত;
আমি তখনও তোমার পটলচেরা
চোখের দিকে নির্লিপ্তে
যুগ্গের তৃষ্ণা মেটানোর নিমিত্তে
চেয়ে থাকব।
সন্ধি!
আমার দুটো চোখ—
তৃষ্ণার সাগর। তোমার
কি ততটুকু জল নেই— সাগরকে ছাপিয়ে যাওয়ার?
তোমাকে দেখার স্বাদ মিটে না।
সাগরের কাছে নদীর পানি যেতে কোনো দিন ক্ষণ লাগে না,
দিবা-নিশি কোনো তোয়াক্কা নেই।
—তবে তুমি কেন আস না?
মাঠের শূন্যতায় রেফারি, প্রকৃতির শূন্যতায় কোকিল,
মনের শূন্যতায় অবচেতন মন
—সর্বদা মিলনের আশে নৃত্য করে।
—তুমি কি তা বোঝ না?
চেয়ে দেখ সন্ধি, ভেবে দেখ,
চোখে চোখ রাখো—
শূন্যতার লেশ পাও?
হে অভিমানী,
বিপ্লব করতে ইচ্ছে করে না,
ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে না অজানা—
কতশত দেয়ালের তালা।
সন্ধি— ভালোবাসি।
বর্ণালী,
আকাশের নীল, তার আমন্ত্রণে
দিগন্ত প্রসারিত মেঠো পথ ধরে
পাশাপাশি হেঁটেছি। হস্ততালুতে তালুতে
ঠোকাঠুকি কত;
উচ্চহাসিতে মাতোয়ারা যত।
গল্পের কোনো কাহিনি নেই;
তবুও প্রমোদ শত শত।
বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের ঈশান কোণে
অশোক গাছের তলে বসে
কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে বসেছিলে,
বসেছিলাম।
ওই দূর আকাশের নীলে এক গুচ্ছ কালো
মেঘের ভেলা দেখে—
দুজনের চোখ জল ভরে এসেছিল।
এ বীণ কোন টানের, কোন গানের?
জানো সন্ধি,
মাতোয়ারা মাতোয়ারা লাগে,
বীণ বাজে অন্তরে, প্রাণে সঞ্চারিণ।
ভবেতে ডুবি আমি স্বর্গে নাচাই দিল,
অস্তমিত অস্তমিত হেথায়—
যেথায় সন্ধি জীবিত।
হে বাসনাভরা ফুল,
মধ্যরাতের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মাঝে
হীরের মতন জ্বলন্ত নাগিনী কি তুমি?
নদীর জলের ঢেউয়ের চূড়ার বিন্দুতে
সূর্যের কিরণে চকচকে বিন্দুতে কি তুমি?
অবহেলার দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও কি তুমি?
গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, গোলাপ, জবা,
উড়ন্ত ধুলো, উড়ন্ত পাখি, গাছের মগডালেও কি তুমি?
সন্ধি,
তবে কি আমি সত্যিই পরাজিত?
তোমার বাগানে কি কুসুম ফোঁটে না?
মৌমাছি গুনগুন করে না?
কোকিল ডাকে না?
প্রাণ আনচান করে না?
সন্ধি,
পত্র মোর জ্বালা, কত মোর ভাবান্তর,
কথা-আশা-ভাবা-যুক্তি-মেশা অনুভূতি।
প্রেয়সী,
নিও মোর হৃদয় নিংড়ানো দুঃখ,
দীর্ঘশ্বাস, স্বপ্ন, ভালোবাসা, আশা।
যবনিকায় তোমার—
অলক।
[অলক যে একা ভালোবাসে তা তো নয়; বরং অলকের চেয়ে ঢের বেশি ভালোবাসে। তার একটি প্রমাণ হলো, সন্ধি অলককে একটি ক্ষণের জন্যও ভুলতে পারে না। রোদ উঠে— অলকের কথা মনে পড়ে, বাতাস বয়, শাড়ি উড়ে— অলকের কথা মনে জাগে, আকাশে মেঘ জমলে— অলকের কথা মনে জাগে, ভ্যাপসা গরমে— অলকের কথা মনে পড়ে, রাতের— নির্জন আঁধার, উজ্জ্বল তারা, মায়াবী চাঁদ, ক্রীড়াময় জোনাকি দেখেও অলককেই পড়ে মনে। এসব ভেবে মাঝে মধ্যে সন্ধির দম বন্ধ হয়ে আসে। এ তারা কেমন বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে যে, মাঝে মধ্যে নিজের অস্তিত্বটুকুও খোঁজে পায় না। সন্ধির কী এমন হলো যে, একটুকরো হাসির মাঝেও অলকের অস্তিত্ব খোঁজে পায়। তবে সত্যিই কী অলক জাদুকর?
চিঠি তো তাই— যা প্রকাশ করতে চায় তার কিঞ্চিৎ প্রকাশ। অলকের চিঠি পেয়ে সন্ধির কয়েকটি রাত এমনকি দিনের অনেকটা সময় ক্লান্তিহীন অবস্থায় কেটে যায়। অনেকগুলো কথা লিপিবদ্ধ করেছে সে। কিন্তু কোনো লেখাতেই তার যেন মনের কথা পুরোপুরি প্রকাশিত হয় না। তাই সে লিখে আবার হাতের তর্জনীর প্রলয়ে ছিঁড়ে-ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এর মাঝেও কিছু কথা ধরা দিয়েছে অতি যত্নে। শেষে প্রকাশ করার বাসনা ত্যজেছে। অবশেষে অলককে উদ্দেশ্য করে সন্ধির চিঠি—
হে নিভৃত প্রদীপ,
সর্বত্র তুমি নেই—
অক্ষি, মন খুঁজে।
অগোচরে ছায়া তুমি—
গোচরের তরে প্রাণ কাঁদে।
এদিক-ওদিক কাক ডাকে—
আবার কোকিল ডাকলে সুরে।
মন আনচান করে ত্রাসে—
কোকিলের সুরে আনন্দে নাচে।
ভালো লাগে না মোর কিছু—
ভালো লাগে না মোর কিছু।
হে ধ্রুব,
সেই যে শ্রাবণমুখর বর্ষণকালে,
প্রথম দেখা, প্রথম কথা, প্রথম
ভাবের বিনিময় হলো; সাথে—
চুরি হলো মন— খেয়ালের অজান্তে।
বলেছিলে তুমি— সন্ধি মানে মিলন,
দুটি মনের মাখামাখি—
এই তো জীবন।
অলক,
এমনও কি হয়?
প্রথম দিনেই গল্পের ছলে বলে দিলে—
‘ভালোবাসি।’
আমারও তনু-মন দংশনে হলো নীল,
এহেন বিষে ওঝার ঔষধ হয় বিলীন।
হে দুঃখ,
এ কোন পরাধীনতার মালা পরালে গলে,
তুমি বিনা সবই শূন্য লাগে।
কানে তোমারই বাদ্য, চোখে নৃত্য, ব্যাকুল চিত্ত;
খুঁজে পেলাম শেষে—আমিই হয়েছি দৈন্য।
অহমিকা আজ চূর্ণ, রাগ হয়েছে পানি,
মোর ভালো-মন্দ লাগা কেড়ে নিয়েছ তুমি।
অলক,
তৃপ্তি তুমি, ভালো লাগা,
স্পন্দন হে, অনুরাগে তুমি।
স্বপ্নে যে আসো, আবার—
স্বপ্নে বিলাও স্নেহ।
বক্ষে জড়িয়ে ধরো শক্ত করে,
মুক্তি দাও আর পারি না যে।
অলক,
মুখে তো স্পষ্ট করে বলনি সেদিন
ভালোবেসে ফেলেছ আমায়।
করনি তুমি কোনো প্রশংসা
আশে হৃদয়ে জায়গা করার।
তবে কি চোখে চোখ অপূর্ব খেলায়,
মনে মন বুঝে নিল,
পরাধীন করল আমায়।
সেই থেকে অবধি—
আশা বাঁধে প্রাণে মনে,
কবে যে হব ঘরণী—
এই ব্যাকুলে দিন যায় চলে।
এর যবনিকা নেই কি— অলক?
শাস্তি দেবে আর কত?
অন্তর পুড়ে কয়লা হওয়ার বাকি নেই,
মোরে মুক্তি দেবার তোমার কী সাধ নেই?
হে চৈতন্য,
সমুদ্রের ঢেউ যত, বর্ষার পানি যত,
রোদের আলো যত, মেঘের খেলা তত,
দেখে অথবা কল্পনা মনে,
কাছে ডাকবার প্রেরণা জাগে।
পাখির পাশে পাখি বসে, মধু ঘিরে ওঠে মৌ,
যত্ন যত, অবহেলার ভয় তত।
একটুকরো জ্বলন্ত কয়লা মোর অন্তরে;
তুমি আস না কেন—
মোরে মুক্তি দেবার তরে।
অলক,
শুধু বার্তা নয়, গড়া মালা বেদনার,
এখানে রচিত হোক মোর প্রেমগীতি।
প্রিয়,
নিও মোর আলিঙ্গনের বাসনাভরা ফুল,
নিও তোমাকে পাবার আকাঙ্ক্ষার মুকুল।
আমি বন্দি—
ইতি
তোমার—
সন্ধি।
অলকের প্রশ্ন- অন্যের যুক্তি অলক খণ্ডাতে যাবে কেন? তার যুক্তি তো কেউ খণ্ডায় নি? অলক ও সন্ধি যদি পরস্পরের মধ্যে সন্ধি করে থাকে দুজনে এক ও অভিন্ন; তবে অলকের একার দায় পড়েছে কেন?
প্রাণ তব প্রাণ মিলনের বাসনায় ব্যাকুল; তবে সন্ধি অলককে রেখে দূরে— কী করে থাকে? কী করে পারে? যদিও বা দেহকে দূরে রাখা যায় কিন্তু মনকে কী সরে রাখা যায়? বরং পরস্পরের মনেকে পরস্পর ঘিরে কত না ক্রীড়া করে থাকে।
ভালোবাসার মানুষকে কেউ যে রূপেই ভাবুক না কেন (গোপনে অথবা প্রকাশ্যে চিৎকার করে) শতভাগ অধিকার নিয়েই ডাকে। এ উদ্যমের কোনো ভুল নেই, হীন নেই। তাই সে পূর্ণ অধিকার করে থাকে। অলক এসবের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমাজ; সমাজ তো একটা ছাঁকুনি। সমাজের অনেক চোখ রয়েছে, আবেগ রয়েছে, মতাদর্শ রয়েছে। অবুঝ প্রেমের ক্ষেত্রে কখনও সমাজকে চোখে দেখতে পায় না। তাই তো প্রেমে এত বিড়ম্বনা। অলকের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটে। সে আজ অনুতপ্ত। সন্ধির চিঠির জন্য অপেক্ষার অবসানের পর প্রত্যুত্তরে অলক লিখে—
হে সুগন্ধি গোলাপ,
প্রতীক্ষা কী তলোয়ারের আঘাত,
না কী কাঁটার যন্ত্রণা;
না কী দুটোই?
পথের পানে, বায়ুর পানে,
শূন্য আকাশের নীলের পানে,
কখনো সাদা মেঘের দলে;
আবার কখনও উড়ন্ত পাখির পায়ে,
আমার ভালোবাসা আমার তরে,
আমার দম্ভে,
সর্বত্র মধুর যন্ত্রণাময় ক্রীড়ায়—
উল্লম্ব নৃত্য চলে।
হে রোহিণী,
সূর্যোদয়ের ক্ষণে বন্দী হয়ে ছিলাম মোরা,
তবে আজ অস্তবেলার গীত কেনো গাও?
বন্দী তুমি! আর আমি কী নই?
বীজের শক্ত আবরণ ভেদ করে—
অঙ্কুরোদগম হয়নি বুঝি?
তারাগুলো আঁধার কাটিয়ে—
আকাশে ঝলমল করে ওঠেনি বুঝি?
এ কোন বীণে কী যে গাও,
বন্দী বলে কেন রাও!
অন্তরে নূর বিকশিত করে,
ধ্যানে, জ্ঞানে চাও কী মোরে?
কুসুমকে ঘিরে ডিমের আবরণ!
আমার হৃদয়ের মাঝে তুমি
জয় করে রাজ্য—
আমাকে করেছ পরাজয়।
সাথি,
মনে পড়ে সেদিনের সে কথা,
অভিসন্ধি প্রকাশিলে সংসার যথা।
তোমার বদনে বৈকালের আলো আর
বকুল পাতার ছায়ায় ঘেরা;
জ্বলজ্বলে চাহনি আর সুপ্ত হাসিতে
বললে মোরে, ফুটাবে দুটি ফুল,
একটির নাম চামেলি অন্য জন মুকুল।
হেসে ছিলাম, ভেবে ছিলাম, স্বপ্ন যত—
বয়সও কালে দাঁত বিনে উচ্চারণ—
‘থন্দি, ভাআলবাছি’ আরও যত।
কুটিকুটি হেসে চেপে ধরল মোর হাত,
সমস্ত সুখ যেন ধরা দিল—
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে রইল না আর কোনো রাগ।
হে নিষ্ঠুর,
এমন ক্ষণগুলো রেখে—
কোথা থাক তুমি?
পাখি হয়ে উড়ে আসতে ইচ্ছে করে না?
না কী মনে গজেছে দেয়াল;
সে দেয়াল ভাঙবার—
‘স্বাদ আছে হিম্মত নেই,
নাকি হিম্মত আছে স্বাদ নেই?’
সর্বত্র আকুল করে মোরে।
গরল দিয়ে যাও মুখে ঢালি,
তবুও পারব না থামাতে এ আমার প্রাণের আকুতি।
সন্ধি,
আমার এ বচনে, অনুভূতিতে
রাগ নিও না— এই মিনতি।
আগুনে পুড়লে সে আগুন শোনে না কারো কোনো কথা,
মোর পরাণে ধরেছে আগুন;
পুড়ে ছায় হয়ে যায়—
তুমি ছাড়া;
কারও হেথায় কি হিম্মত রয়েছে—
শীতল করবে তাহা।
সন্ধি,
এ বিকেলের রোদ, ও বিকেলেই বৃষ্টি,
এ সকালে নীলাকাশ, ও সকালে ঘুমটি।
ক্ষণিকের কথাই কি হলো সব,
এ দীর্ঘ মনোনিবেশ, বাসনা সবই কী বিফল?
ভ্রান্তির ক্লান্তিও তো হতে পারে,
এ মনুষ্য-সীমাবদ্ধতর/হীন।
প্রাণের সাথী তুমি,
তবে আমার অপরাধে কিঞ্চিৎ ভাগী— তুমিও কী নও?
আমার হীনে আমি সুধরাবো—
ভুল বোঝার পর?
তবে তুমি কী মোর সহযোদ্ধা নও?
তবে বকুল তলে কেন বলেছিলে—
আমার সুখে তোমার সুখ,
আমার দুঃখে তোমার দুঃখ,
আমার অশ্রুতে তোমার চোখ ভিড়ে ওঠে অশ্রুতে।
সন্ধি,
বাসন্তী ফুলে প্রবেশ দ্বার ঘিরে ওঠে—
কত আহ্লাদে, কত মাধুর্যে !
বিনা বাসন্তী, বিনা প্রবেশ দ্বারে,
আকুতি করে মরে অভিসম্পাদের বানে।
তুমি আমার,
আমার বলিয়াই অধিকার করি;
তাই আজ স্বীকার অনিবার্য।
এহেন ফোঁটা সতেজ কলিকে—
মেরে ফেল না সন্ধি।
যা পারবো না-তা গোপন করা— কাপুরুষতা।
তাই সেদিন মিছে অভিনয় হয়নি,
এ আমার দৈন্যতা।
হে লাস্যময়ী,
সেদিনের সেটা ছিল মোর ভুল,
ছিল না মোর ইয়াদে।
‘বিশ্বাস ছিল মোর,
মন যা চায় তাহা করিতে।’
আমার মনের নিয়ন্ত্রক বলেই মানুষ,
ভুল হওয়ার পর ধরা দিলো চৈতন্যে।
তখন খুঁজেছি তোমায়—
কিন্তু দৈহিকে কাছে এলেও
অন্তর থেকে দূরে ঠেলে দিলে।
কিছুদিন পর তাও সরে গেলে।
ভুল কী শুধুই আমার—
তোমার কী নয়?
জ্বলন্ত কয়লা বসিয়ে দিলে অন্তরে,
এখন নীল যন্ত্রণার ধোঁয়ায়
মাতোয়ারা করে।
সন্ধি,
এ দলিল অনুভূতির ও স্মৃতিময়ের,
গাঁথা আছে হৃদয়ে যে প্রাণময় স্মৃতি।
হে মোহিনী,
ক্ষমা চাই নে বিচার কর,
করুণা চাহিনে অন্তরকে প্রশ্ন কর।
যদি মিলন বাসনা জাগে দুজনার,
এ তো নিয়তির টান— বোঝ না?
কর পরখ,
তুমি মোর তীর্থক।
ইতি,
তোমার প্রেমী—
অলক।
মনে আনন্দ না থাকলে শরীর নির্জীব থাকে। আর প্রফুল্লতা থাকলেই শরীরে আনন্দের ঢেউ খেলে। সুতরাং মন হল দেহের পরিচালক। সন্ধি তার মনকে অলকের পানে সর্বান্তঃকরণে সঁপে দিয়েছে। তাই সে এখন পরাধীন। তারপরও অতীত বলে একটা অবস্থান তো থাকেই। আজকের এ অন্তরা মল্লিক সন্ধি একাই এতো বড় হয়ে ওঠেনি। আরও উচ্চতর ভাবে ভাবতে গেলে বলতে হয়- রক্তের সম্বন্ধের যারা, তারা সন্ধির বেদনায় ব্যথিত হয়। আনন্দে আনন্দিত হয়। অপমানে অপমানিত হয়। তারা কেনো এসব বোধ করে? তবে কি সন্ধি তাদের কাছে ঋণী? তবে কি তাদের সাথে বিবেকলব্ধ সম্পর্ক বিদ্যমান?
যদিও আগের মতো সন্ধির অলকের প্রতি ক্ষুদ্ধতাবোধ নেই, অভিযোগ নেই। তবুও কথা থাকে। সে অকৃতজ্ঞের মতো অতীতকে কাঁদিয়ে বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না। এটিও ঠিক সন্ধি মনে-প্রাণে অলককে ফিরে চায়। অলক তার বাসনাভরা ফুল। তাই সন্ধি অলকের চিঠির প্রত্যুত্তরে লিখে দেয়—
আমার সুখের বাঁশি,
কী করলে যে হায়—
প্রাণ কেবলই যে উধাও।
তুচ্ছ যৌবনের বীণ—
তুচ্ছ আরও যত ঋণ।
ভাবিনি তবুও ভাবতে হয়েছে—
বুঝিনি তবুও বুঝতে হয়েছে।
ফুল ফুটেছে বনে—
মেঘ জমেছে আকাশে।
তবে আমার কেন এমন হলো—
বাঁশির সুরে মর্তে কান্না এলো!
গগন চেয়ে পেয়েছে বিশালতা,
নদী পেয়েছে আছড়ে পড়া ঢেউ।
দোয়েলের শিস আর কোকিলের মিষ্টি গান,
বাবুই বেঁধেছে বাসা স্বপ্ন করে বাণ।
আমি কি পেয়েছি কিছু—
দুঃখ বিনা, তিক্ত বিনা মান?
তুমি কি একাই—
আমি কি বাসিনি ভালো?
আমার অন্তর নেই— পুড়ে না?
আমার কি শূন্যতা নেই— নেই আকুতি?
অলক,
মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়লে
মাটি যেমন শুষে নেয়;
তেমনি তোমার ভালোবাসার আবেদনকে—
আমার অন্তর শুষে নিয়েছে।
সূর্যদাহ কর্ষে
মাটির বক্ষ থেকে জল বাষ্পীভূত করে।
নতুবা—
মাটিতে সে জল ধারণ করে
বৃক্ষরাজির ফুল-ফল ফুটায়।
ধরণীকে দেয় এক অনাবিল শুভ্রতা।
অলক,
আমরা সেই শুভ্রতা ছড়াব।
—ছড়াব না?
হে কুঞ্জ,
চোখের মণির পরে বসা প্রজাপতিটা
কেবলই ঐ রংধনুর দিকে উড়ে;
যেখানে মুহূর্তেই হরেক রং
প্রস্ফুটিত হয়ে সুখে স্বপ্নের দ্যোতি ছড়ায়।
বিভোর করে, গভীর করে— চাওয়া।
সে স্বপ্নকেই কুসুমের ন্যায়
আগলে রেখে বেঁচে আছি।
বাস্তব হলো এই—
বেঁচে আছি। আর
অবাস্তব হলো—
হয়তো বেঁচে থাকবো।
অলক,
প্রবাদে আছে—
‘মাছটার জন্য নয় বরং
জিনটার জন্য মরি।
আমি আমাকে তোমার তরে
উৎসর্গ করেছি। সেই
সাথে চূর্ণ করেছি আমার বেড়ে ওঠার
সকল দাম্ভিকতা।
এখন নিজেকে আমি বলে,
আমি স্বাধীন বিশ্বাস করতে পারি না।
একচ্ছত্র ঘুড়িটায় আজ সুতার টান লেগেছে।
মুক্ত আকাশে সীমাবদ্ধতার টান লেগেছে;
তবুও তাতেই মধুর লাগে।
হে অবুঝ,
আমি বলছি না যে—
অন্যায় চাওয়া মেনে নিয়েছি।
আমি বলছি তোমায়—
আমাদের যেটা ভালো লাগে তা
সবারই ভালো লাগবে?
তুমি বোঝ না কেন—
আমার রক্তের বন্ধনের কেউ রয়েছে।
না হয় আমি সব মিথ্যে
বলে মেনে নিলাম;
মনকে বুঝালাম।
তাই বলে—
তাই বলে, আমার রক্তে প্রবাহিত
সম্পর্কের মানুষগুলো মিথ্যে বলে
নিঃসংকোচে মেনে নিবে; কী করে?
তবুও আমি নই তাদের সমর্থক!
কিন্তু,
তাদের চোখের লজ্জা ভরা—
ক্রোধ, সম্মানের ব্যত্যয়ে ছলছল জল।
আমি তো তাদের হাতে গড়া।
তারা তো আমার হাসিতে হাসতো,
আমার কান্নায় তারা বিচলিত হতো,
আমার আনন্দের জন্য প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখতো।
আমি তো তাদেরই অংশ।
আমি তাদের কলিজার টুকরো।
আমি কীভাবে পারি তাদের—
বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস, কষ্ট উপেক্ষা করতে?
হে স্নিগ্ধ,
রাগ নিও না।
আমার জীবনের উদয়কালে সঙ্গী তারা,
আর অস্ত বেলায় তুমি।
আমি মধ্যাহ্নে বসে উদয়কে
উপেক্ষা করতে কী করে পারি?
আমি জানি,
আমাকে অস্ত বেলার কাছে সমর্পণ করতেই হবে।
তবুও,উদয় কালের যারা
আমি তাদের কাছেই সম্পূর্ণ ঋণী।
অলক,
তুমি আজ যার জন্য ব্যাকুল—
সে কে তুমি জান?
—‘অন্তরা মল্লিক সন্ধি।’
অলক,
প্রকৃতির নিয়তি মেয়েকে অন্যের ঘরে দিতেই হয়।
আদরের সন্তান একদিনেই পর হয়ে যায়।
এতদসত্বেও জেনেও
আমার মুখে বিষণ্নতা দেখলে তারা—
বিচলিত হয়ে পড়তেন।
আমাকে খুশি করার জন্য—
কত যে বেদনা পাড়ি দিয়েছেন।
কী করে পারব বলো—
ও অলক! তাদের চোখ ভিজে দিয়ে কী করে পারবো?
অলক,
তুমি আমার সহযোগী।
রক্তের বন্ধনে যারা মোর প্রেরণা,
তাদের প্রতি ভালোবাসা রক্তে মেশা,
তারাই আমার মন্দির, বাসনা।
অলক,
এ কালে বেদনা অন্য কালের তা সুর,
সব কী গাওয়া যায় যত মোর ভীতি।
হে বিষণ্ন ভ্রমর,
ফুটুক কলি, সৌন্দর্যবিলাক ফুল,
ঝরুক পাপড়ি।
পাখির কণ্ঠে তুলুক গুনগুন গান,
স্বপ্ন বিলাস, উল্লাস, কল্লোল।
চোখের সুরমা।
মেঘের ফাঁকে সূর্যালোকের ঝলক,
ওহে কর মোরে মুক্তি,
এ মিনতি—
ইতি,
তোমার সন্ধি।
অন্তর চৌধুরী— অলক ও সন্ধির কলেজ জীবনের বন্ধু। অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল হিসেবে বন্ধুমহলে তারা বেশ খ্যাতি রয়েছে। সে একসময় সন্ধিকে পছন্দ করত। পরবর্তীতে ওরা তিনজনেই ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। এখন সে বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ালেখা করছে। তবে পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরিও করে। এ জন্যই সে অনেক ব্যস্ত সময় পার করছে। সেখান থেকে সমস্ত কাজের ভিড়ে দম নিলে আপন দেশের কথা, দেশের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে তার। তখন সেই স্মৃতিকাতর মন অবচেতন ভাবে চোখের কোণ থেকে জল ছলছল করে ওঠে।
বেশ কিছুদিন বিরতির পর সে অলকের চিঠি পায়। অলক তার চিঠিতে সন্ধি ও অলকের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়নের কথা উল্লেখ না করে বরং সুসম্পর্কের কথাই লিখেছে। কিন্তু অন্তর তার আগেই অলক-সন্ধির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তার অন্য এক বন্ধুর কাছ থেকে জেনেছে। তবে সন্ধিকে তার নানুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ কথা সে জানত না।
সন্ধি ও অলককে সম্বোধনপূর্বক অলকের ঠিকানায় বহু স্মৃতিচারণ, জীবনদর্শন, পরামর্শ দিয়ে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে।
বি.দ্র.: চিঠিটি প্রথমে অলক গ্রহণ করে। এর কিছুদিনের মধ্যেই চিঠিটি সন্ধির ঠিকানায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হয়। ]
প্রিয় সন্ধি ও অলক,
পরসমাচার জেনে খুশিই হলেম,
তোমরা দুজনেই খুশি, আমিও খুশি।
মোর সব ঠিকঠাক রয়েছে বন্ধু হে,
কৌতূহল?— ‘এখনও শাদী করিনি যে।’
মায়ের অনলে আছি এক ছেলের যা,
পুত্রবধূ রাজকন্যা সংসারী হবে তা।
খুঁজছেন হন্যে হয়ে সুন্দরী উত্তম,
আত্মীয়বর্গ, পরিচিত, পাড়াপড়শি।
মজার বিষয় যে এখনো মিলেনি হে,
এর সুবাদে এখনো গলা কাঁটেনি যে।
আমি চাই বধূ মোর মনের মতো যা,
মা কিছুতেই বোঝেন না, বাবাও যে তা।
প্রিয় সন্ধি,
বকুল ফুল কুড়াতে গিয়ে হলো দেখা,
তখন হয়তো বয়স হবে তেরো বা
চৌদ্দ। সেই থেকে আজও হয়নি টুটা—
বন্ধুত্ব, হৃদ্যতা আর পরমাত্মীয়তা।
দুঃখ বনে বসে দুঃখ বিনা নাই ঠাঁই,
কর্ম ধরেছে চেপে তাই প্রমোদ নাই।
জেনে খুশি হয়েছি ওহে— করেছ দেখা,
অলক মোর উত্তম বন্ধু, জ্ঞানী কিংবা
স্বাভাবিকতা। পরিণাম হোক; নহি টুটা—
টুটা প্রাণ সইতে পারবে না জানো তা।
এ বড় বিষাদ ক্ষেত্র বড় বিস্তৃতিই,
কান্না ভেজা অন্তর আর তিক্ত স্মৃতি-ই।
এ পরামর্শ যেন মোর পালন করো,
প্রত্যেক মানুষ ভিন্ন গুণের গুণী যে;
তোমার গুণে গুণান্বিত নয় এ যপে—
সাধু, সরলতা, ক্ষমায় আপন করো।
প্রিয় অলক,
অনেকগুলো দিন একত্রে মনে পড়ে,
কথাগুলো গুচ্ছভাবে কানে এসে বাজে।
অমল, কমল, বেলী, সাবিনা, চন্দর,
ওদের সাথে আজও তোর কথা হয়?
আচ্ছা, অশোক-শিউলির প্রেম রয়েছে?
কত যে পাগলামি। ধর্ম ছেড়েছে কেউ?
রাজা বা প্রজা সব পরাধীনতা গড়ে,
স্মৃতি তারে কাতর করে সমস্ত কাজে।
আমি সেই সমুদ্রে হাতড়িয়ে কাতর—
ফিরে যেতে ইচ্ছে করে রে সেই বেলায়।
নিয়তি/প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর করেছে
—জীবন। অতীত স্থানে ফিরবে না কেউ।
বন্ধু থাক এসব, পরসমাচার কি?
শুভকাজে দেরি করো না এ যে অন্যায়
বলে জানি। সামনে ফাল্গুন এই যেন,
ভালো ভালো সবই ভালো বিয়ে করিও।
মশকরা আর যা করি দেরি ন করো,
দেয়া কথা বিলম্ব করিলে বিড়ম্বনা
বাড়ে তত। সন্ধি বড় চমৎকার এবং
আমার প্রিয় বন্ধু, শান্ত, মায়াবী কত।
শুনিলাম কিছু টুকিটাকি ঘটেছে যে—
ইহাই বড় ক্লান্ত করিছে দুজনকে।
এ ক্লান্তি আসলে কষ্টি পাথর— যে হয়?
আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা তত্ত্ব যে লয়।
শুনো,
পথিমধ্যে মাতাল দেখে দাঁড়ালো সাধু;
মাতালের বিলাপে বুঝিলো সাধু এই—
কেহ নেই যে স্নেহের; যন্ত্রণা বিভুই।
স্নেহে-মমতায় মাতালকে নিয়ে পাশে,
শুনিলেন তাহার শত আকুতি হেন।
কখনও হাসিলো, কাঁদিলো, অভিযোগ,
ভালোবাসে না কেহ— কষ্ট অন্তরে শত।
চারটি পয়সা দিয়ে কহিলেন সাধু,
আমি তোমার আপন আজ থেকে জেনো।
আগামী কল্য খাবার লইয়্যা থাকিবো।
আসিবে বাবা? এই মিনতি টুকু রাখো।
কোন প্রাণী যে আছে স্নেহ না চায় বলো,
মাতাল তাতে কী? —তার অনুভূতি নাই?
সাধু মাতালকে বুঝালেন— ভালোবাসে
সবাই; শুধু অনুভূতি নাই বোঝার।
পরামর্শ হেতু মাতাল সাজল সাধু—
আজ্ঞাবহ হইয়া লইয়া গেল নিজ
মৃত্যুসংবাদ—‘পিষ্ট বাসের চাপায় সে।’
দমকার সমেত কান্নার আওয়াজ
মেতে উঠল বাড়িময় শত বিলাপে।
বাবা ভাঙিয়া পড়িলো, ভাই-বোন সহ,
পাড়াপড়শি কাঁদিলো সান্ত্বনাও দিলো।
অভাগী মার চিৎকার-বিলাপে লুটে
খোকা মোর মানিক সোনা বুকে আয় রে।
বিলাপে বিলাপে বামে ঢুলে আর ডানে,
জ্ঞান হারায় ক্ষণে ক্ষণে; আবার জ্ঞান
ফিরে সামনে ঝুঁকে আর তাজা মাছের
মত হাত আছড়ায়ে কাঁদে আর কাঁদে।
ভণ্ড মাতাল ভণ্ড বেশে পেল ‘গু’ শিক্ষা,
এই লাথি চোখের পরে ভাঙুক নেশা।
পাখির বেশে শেষে ফিরে সাধুর কাছে,
নেই, সাধু নেই! কোথাও নেই! —কে সাধু?
কি মন্ত্র তাকে করিলো যন্ত্র, কি মন্ত্রে সে
হলো মানুষ— ‘সাধু নাকি তার চৈতন্যে?’
ভাবি যাকে হে যন্ত্রণার বিষে, কলুষে;
সেও কি তাই ভাবে নাকি ভাবে কুসুম
বনে মৌমাছির নৃত্যে পায়ে স্বপ্ন বাঁধে।
বন্ধু, অভিমান ভাঙতে হয়রে দ্রুত,
নতুবা ভ্রান্তির পাহাড় গড়বে তাতে
—সু-উচ্চ। যাহা অধিকার তাহা ছেড়ো না—
পুড়ে রাঙা হোক তবুও স্বর্ণ ছেড়ো না।
চিঠিতে,
একটি লাইনে কত যে কথা জীবন্ত,
তারার মতন জ্বলে স্মৃতি অনন্ত
বন্ধু,
পুনরায় ফিরে পাবো না সেই অনাবিল,
কল্লোল, হিল্লোল, উল্লাস উদ্বেল যত।
এতটুকু সুখ জাগে এতটুকু ভেবে—
আছে কিছু স্মৃতি তার বন্দনা করিতে।
দিও পত্র, নিও খবর—
ইতি,
তোদের কৈশোর বন্ধু—
অন্তর।
যে অধিকার জীবন্ত তা মুষ্টিবদ্ধ করতে গিয়ে গোল করাটা নির্বোধের পরিচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাছাড়া অলক প্রায়শ্চিত্যের চৈতন্যজাগরণ উপলব্ধি পূর্বক ক্ষমার্চনার আসনে উপনিবেশ করেছে। এর ফলে অলকের মনে সন্ধিকে নিয়ে স্বপ্নগুলো আরও নৈপুণ্যের আসনে আসীন হয়েছে। এর পিছনে অন্যতম প্রেরণা হল তাদের বন্ধু অন্তরের চিঠি। তাই এখন অলক সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা চাওয়া পূর্বক সন্ধিকে ঘিরে স্বপ্নের কথা / মিলনের কথা / পরিণতির কথা উল্লেখ করে সন্ধিকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছে—]
হে বর্ণালী,
দোলিব সমীরণের ছন্দে, তাই তো
তোমায় স্বপ্ন দিয়ে ঘিরে।
হাওয়াই বোমের ফুলিঙ্গের দ্যুতি-তে
প্রফুল্লে মোহিত হব বারবার।
কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় মুকুট বরফে—
রবির আলোয় জ্বল জ্বলে আরও পুণ্য করে।
তুমি তো তা-ই; মুকুট সাজে
পুণ্য রূপে দেবীর আসনে পাই।
দূর শূন্যে নীলের মাঝে ঐ গাঙচিল,
উড়ছে একা— বিষাদ মনে নিশানা নেই ঠিক।
হে রোহিণী,
অপূর্ব চাহনি তোমার অপূর্ব ভ্রু,
বোঝার মত মন চাই— শুধু তাই নয়?
প্রতিটি অনুভূতি যদি মর্যাদা না পায়,
জীবন তবে নিরর্থ; সম্পর্ক হবে কু।
দেখ চেয়ে দেখ অগ্নি ফুলিঙ্গ উড়ে,
আমাকে পুড়াতে ইচ্ছে হয় না বারেবারে?
আমি আগুন, তুমি মোম,
মোমের মত গলে মোর বক্ষে লোকাবে..?
শান্তি আর ক্রীড়ায় মাতোয়ারা হব,
আমি তখনও কেশ এলিয়ে দিয়ে—
স্বপ্নতারায় উন্মাদনা ছড়াবো যত।
ওই দূর পানে যেখানে পূর্ণিমা চাঁদ
আর তারা খেলা করে;
হেথায় হবে মোদের বাসর—
কোনো নিমন্ত্রণ নেই, ব্যস্ততা হবে শূন্য।
সন্ধি,
সাজাবো মনের সমস্ত মাধুরী মিশে;
পুরো শাড়িতে লতার নকশি দেব এঁকে—
হীরা, চুনি, পান্না আর আঁচলে
উজ্জ্বল-ঝলমলে তারাগুলো ছড়িয়ে।
কপালে দেব— সুখ তারা।
বাসর ঘর সাজাতে এনে দেব ওই প্রভাত রঙ।
চাঁদকে ঘুমোতে দেব না আর,
সারা রাতভর ছড়াবে আলোর শুভ্রতা।
ঘরময় থাকবে কুঞ্জ (সুগন্ধি) পাথর ছড়িয়ে, আর—
তার সুবাস ছড়াবে বায়ুর ঢেউয়ে ঢেউয়ে।
সন্ধি,
একটি শাড়ি বিছাবো বিছানায়,
আঁচল রবে বালিশের পরে।
এখানেই দুজনে শোবো,
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে সাক্ষী রেখে।
এর থেকে আরও পরে—
ফুল হয়ে আসিব দোলাতে
ঘরময় ছড়িয়ে উল্লাস।
ফোকলা দাঁতে খিলখিলি হাসি
যেন এক টুকরো জন্নাতের সুখ
—ঘরময় থাকবে ভরি।
সন্ধি,
ফুলের সুবাস টেনে নাও চোখ বন্ধ করে,
দেখবে মনের সকল দুয়ার খুলে গিয়েছে।
কুয়াশার আঁধারে ফিরে কে তাকায়,
ভণ্ডবেশী ভালো লাগার ছায়ায়।
কে, সে?
কাহার আওয়াজ পাও,
মনের এতগুলো দরজা ডিঙিয়ে,
আসন গড়েছে হেথায়?
সন্ধি,
ক্ষমা করো মোরে।
সেটাই ছিলো মোর অপরাধ—
তোমাকে আমার অধিকার বলেই বোধ করি,
তাই চুম্বনে করেছিলাম সিক্ত হওয়ার বাসনায়।
এ যে ভুল, অন্যায়— তখন ধরা দেয়নি ওহে,
সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা চাই—
তোমার শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে— এই যেন।
হে ভ্রামরী,
কোকিল ডাকলে খুঁজি তোমায়,
রোদের স্পর্শেও।
গানের তালে তালে, নৃত্যের ছন্দেও,
হাসি বলো আর কান্না,
রয়েছো সর্বত্রই পদ্ম হয়ে মোর প্রাণের মুকুটেই।
তুমিও কী ব্যাকুল, আকুল করে না,
অন্তরের অতৃপ্তি, জ্বালা, দীর্ঘশ্বাসের সাথে
—পাগলপারা করে না হে?
যদি নাই বা দিতে পার ক্ষ্যান্ত,
আসো মিলিত হই, স্বপ্নগুলো ছুঁই।
যৌবনকে করি জ্যান্ত,
জীবনে গড়ি ছন্দ— অনন্ত।
সন্ধি,
এ স্থানের কুসমন যায়রে দিগন্ত,
তার হৃদয়ে ছড়াবে মায়া প্রাণবন্ত।
সন্ধি,
বাহারি ফুলের গাছ রোপণ করেছি,
বিস্তীর্ণ ভূমিতে জলাধার গড়েছি।
প্রতিটি গাছে থুঁকাথুঁকা কলি;
ওরা আজ নিষ্প্রাণ, মলিন, ম্লান।
মালি মালি ডেকে কান্নার ক্ষীণ আওয়াজে,
কর্ণগোচর কর তুমি ভালোবাসার স্নিগ্ধতার মমতায়ে।
হে মোর বর্ণিল আকাশ—
সাথী হারা পাখি, কী করিয়া থাকি;
পুষ্পাঞ্জলি নাও শত শতক
ইতি,
তোমার প্রিয়তম,
অলক।
মেয়েদের কঠোরতার দেয়ালের আড়ালে ক্ষমার অংশ-ই বেশি থাকে। সন্ধি অলককে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। তাই অলকের প্রতি সন্ধির অনুরাগ আরও তীব্র। নকশিকাঁথার প্রতি ফুঁড়ে ফুঁড়ে যেমন নারীর মনের লোকায়িত স্বপ্নগুলো ভীড়ে ওঠে, ঠিক তেমনি করে সন্ধির প্রতিটি অনুভূতি বা স্বপ্নগুলো অলককে ঘিরে যত্নে বেড়ে ওঠেছে। সে স্বপ্নগুলো দিয়ে সে একটি ছবি দেখেছে।
আজ সন্ধির হৃদয়ে যে মীমাংসার প্রার্থনায় জেগে ওঠেছে তার কাতর উল্লাসগুলো উল্লেখপূর্বক সন্ধির অলককে চিঠিতে লিখেছে। সন্ধির এই চিঠি—
হে মন্দির,
মোর প্রিয়তম
—আমার ভালোবাসা,
একটা দিনও তো নয়
—একটা সপ্তাহ কী করে হয়?
মনের অগোচরে গেছ
—ভুলতে বসেছি এমন নয়।
তোমায় ভালোবাসি প্রচণ্ড
—বাসনা ত্যাগেছি সুখের আশা-লয়।
হৃদয় জুড়ে রয়েছো
—আকাশ জুড়ে তোমার-ই বিচরণ-তয়।
এমন কোনো স্থান নেই;
ডালে ডালে, ফুলের পাপড়ির পরে,
সূর্যকিরণে রেণুর হাসিতে,
সাদা মেঘ, পায়রা, কাশফুলে,
আমার অন্তরের বর্ণে বর্ণে—
কোথাও নেই তুমি,
তবুও খুঁজে ফিরি অকারণে।
মোর হাসি-কান্না, চেতন-অবচেতন,
দিবা-নিশি সব করেছ জয়।
রাজ্য আমার আর মুকুট তোমার,
তাই প্রজারা (সকল ইন্দ্রিয়) তোমার পিছু লয়।
ধিক্ ধিক্ শত ধিক্— হে আমার হৃদয়,
সে আমাকেই করেছে পরাজয়!
আজ, বজ্র আওয়াজে কম্পিত করছে মোরে,
নিশানা উড়িয়েছে সে বন্ধনে হতে— স্থির।
অলক,
বসন্ত, কে এনেছে এ ধরায়—
এ প্রকৃতি, না সময়?
আজিকে এই ক্ষণে প্রশ্ন রইল;
কী বুঝলে? উত্তর দাও।
বুঝনি তুমি ও হে মোর প্রাণের ভ্রমর— সুরমা;
আমার বাবা-মা, আর শুভাকাঙ্ক্ষী তোমায় করেছে ক্ষমা।
আঁধারে তারাগুলো কদম ফুলের সাজে,
চাঁদকে দেখ প্রস্ফুটিত রূপে হাসে।
বাতাসের ঢেউয়ে মনের মাঝে উল্কা ঝড়ে,
বৃক্ষের পত্রগুলো এলোমেলো ছন্দ তুলে।
নিঃশ্বাস কখনো বুকে বাঁধে, কখনো ঝড়ো বেগে,
পথ পানে চেয়ে আছি এই বুঝি আসলো সে— মেঘে উড়ে।
অলক,
চিঠি-চিঠি এ গুনগুন গান অনন্ত,
চিঠির বদৌলতে প্রাণের দাবি— জীবন্ত।
হে মোর সাধনা,
মূর্ছা যাই কেন জানি না,
তুমিও কি তাই?
আর পত্র পাঠিয়ো না—
সম্বন্ধের দূত চাই।
আর কোনো বাধা নেই—
হতে চাই মোরা স্থায়ী— বন্দী।
ইতি,
তোমার প্রজাপতি,
সন্ধি।
পত্র উপন্যাস : চিঠি
কলমে : তারিকুজ্জামান (তনয়)
স্থান ও সময় : ২৯-০৯-২০১৯
♦️আরেকটি উপন্যাস পড়ি— (উপন্যাসটির নাম— লেখক।)
বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
১। সনেট কবিতাঃ “চিঠি” এর প্রথম আট লাইনে আলোচ্য বিষয়ের সমস্যার কথা বলা হয়েছে। যেমন-
পত্র মোর জ্বালা, কত মোর ভাবান্তর,
কথা-আশা-ভাবা-যুক্তি –মেশা অনুভূতি।
শুধু বার্তা নয়, গড়া মালা বেদনার,
এখানে রচিত হোক মোর প্রেমগীতি।
এ দলিল অনুভূতির ও স্মৃতিময়তার,
গাঁথা আছে হৃদয়ে যে প্রাণময় স্মৃতি।
একালের বেদনা তা অন্যকালের সুর,
সব কী গাওয়া যায় যত মোর ভীতি।
একটি লাইনে কত যে কথা জীবন্ত,
তারাদের মতো জ্বলে স্মৃতিতে অনন্ত।
এ স্থানের কু-সমন যায়রে দিগন্ত,
তার হৃদয়ে ছড়াবে মায়া প্রাণবন্ত।
চিঠি চিঠি এ গুনগুন গান অনন্ত,
চিঠির বদৌলতে প্রাণের দাবি– জীবন্ত।
—নায়কের দুইটি আর নায়িকার দুইটি চিঠি— মোট চারটি চিঠির ইতি লেখার পূর্বে সনেটের দুইটি করে লাইন যুক্ত করা হয়েছে। সনেটের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রথম আটটি লাইনে সমস্যা থাকতে হয়; আমার উপন্যাসেও প্রথম চারটি চিঠিতেই তাদের সম্পর্কের সমস্যার কথা বলা হয়েছে। অন্ত্যমিল হলঃ ক+খ, ক+খ, ক+খ, ক+খ
২। সনেট কবিতাঃ “চিঠি” এর শেষ ছয় লাইনে আলোচ্য বিষয়ের সমাধানের কথা বলা হয়েছে। যেমন—
চিঠিতে,
একটি লাইনে কত যে কথা জীবন্ত,
তারার মতন জ্বলে স্মৃতি অনন্ত।
সন্ধি,
এ স্থানের কু-সমন যায়রে দিগন্ত,
তার হৃদয়ে ছড়াবে মায়া প্রাণবন্ত।
অলক,
চিঠি চিঠি এ গুনগুন গান অনন্ত,
চিঠির বদৌলতে প্রাণের দাবি– জীবন্ত।
—তাদের বন্ধু + নায়কের + নায়িকার প্রত্যেকের একটা করে চিঠির শেষে ইতি লেখার পূর্বে দুইটি করে সনেটের লাইন যুক্ত করা হয়েছে; যার প্রত্যেকটি লাইনে যেমন সনেটের আলোচ্য বিষয়ের (চিঠি) সমস্যার সমাধান রয়েছে তেমনি উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহের সমাধান রয়েছে। অন্ত্যমিল হলঃ ক+ক+ক+ক+ক+ক
*৩। উপন্যাসে নায়িকার মোট তিনটি চিঠি রয়েছে যার শুরুর দশ লাইন বাম-ডান অথবা উপর-নিচ যে ভাবে পড়া হোক অর্থ মিলবে। যেমন—
হে নিভৃত প্রদীপ,
সর্বত্র তুমি নেই—
অক্ষি, মন খুঁজে।
অগোচরে ছায়া তুমি—
গোচরের তরে প্রাণ কাঁদে।
এদিক-ওদিক কাক ডাকে—
আবার কোকিল ডাকলে সুরে।
মন আনচান করে ত্রাসে—
কোকিলের সুরে আনন্দে নাচে।
ভালো লাগে না মোর কিছু—
ভালো লাগে না মোর কিছু।
*৪। বন্ধুর লেখা চিঠিতে সাতানব্বইটি লাইন রয়েছে যা চতুর্দশ কবিতার ছন্দে রচিত। এবং প্রথম ছত্রিশটি লাইনে রয়েছে যার অন্ত্যমিলঃ— ১+৭, ২+৮, ৩+৯, ৪+১০, ৫+১১, ৬+১২.
🪭
🌺 আরও দেখি- ছোটগল্প
🌺 আরও দেখি- কবিতা
🌺 আরও দেখি- আর্ট
🌺 আরও দেখি- উপন্যাস
🪭
-
Facebook | 🔵 f : facebook.com/bonopushpa
- Instragram | 🔷 www.instagram.com/tariquzzamantonoy/
-
YouTube | 🔴
: @tariquzzamantonoy3123
- 🐦 Twitter | 🔵 T : @bonopushpa
- 🌐 Website | 🔷 www.bonopushpa.com
🍁