লেখক | বাংলা উপন্যাস | তারিকুজ্জামান তনয়
উপন্যাসঃ লেখক | তারিকুজ্জামান তনয়
সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল বেয়ে বৃষ্টির পানি কাঁচা ঘরের পিঁড়ে ঘেঁষে পড়ে টিপটিপ ছন্দ তুলছে। কাঠের চেয়ারে এলিয়ে বসে হিম হাওয়া অনুভব করে লেখক সেই বৃষ্টির ছন্দে মনের মিতালি মিশিয়ে এক অদ্ভুত রকম আনন্দ উপভোগ করছেন। এহেন পরিবেশে তিনি একটি কবিতা সাজাতে উদ্যত হলেন। গ্রামে বসবাস করা মানুষগুলোর সহজ সরল ভাবনাগুলো, ব্যবহার, আতিথেয়তা, শ্রদ্ধাবোধ এবং গ্রামের মনোরম প্রকৃতিক পরিবেশ সহ সবকিছু নিয়ে একটা কবিতা সাজানোর চেষ্টা করছেন।
শহরের মানুষগুলো মানুষের সাথে ধাক্কা খেলেও পরস্পরের সাথে কথা বলতে চায় না। কিন্তু গ্রামে তার উল্টো। গ্রামের মানুষগুলো কোনো অপরিচিত কাউকে দেখতে পেলেই হাজারো জেরা করতে করতে এমন পরিস্থিতি করে ফেলে যে একাকিত্বে সময় কাটানোর মত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে যারা গ্রামে আসেন না বা তাদের আসা হয় না, এদের বেশির ভাগের বেড়ে ওঠা গ্রামে।
লেখকের দশম শ্রেণী পর্যন্ত গ্রামেই কেটেছে। বর্তমানে শহরে যাদের জন্ম, তাদের শৈশবটায় গ্রামের দুরন্তপনার মাঝে বেড়ে উঠা। তখনকার সময়ে গ্রামের ছেলেদের দুরন্তপনা দেখে এখনকার শহুরে মায়েদের গায়ে জ্বর উঠে যেত। খালি গায়ে ধুলোর পরে লুটোপুটি, বর্ষাকালে কাদামাটি মেখে বিকৃত চেহারা, শীতে মজা পুকুরে শ্যাওলা পানিতে ঝুপঝাপ ডুব দেওয়া। বোরো ধান কাঁটা হলে বিস্তীর্ণ মাঠে গোল্লাছুট, ফুটবল, গারো-গোদন সহ আরও কত কি!
গ্রাম হল নাড়ি, মায়া। গ্রামগুলোতে রঙের মাখামাখি। গ্রাম উদার। গ্রাম হল প্রিয় বন্ধুর মতো। গ্রাম মৃদু-মন্দ সুবাসের আকর। গ্রাম হলো জীবন বাসনার শেষ মাটি। গ্রাম সবার ভালোবাসা। আমরা সবাই গ্রামকে ভালোবাসি। বাঁচতে চাই গ্রামের সুবাস নিয়ে, আবার লুকাতে চাই এরই কোনো শস্যক্ষেতের পাশ ঘেঁষা মাটিতে।
স্বপন, লেখকের বন্ধু। একটি গল্প লিখতেই লেখক স্বপনদের গ্রামের বাড়ি এসেছেন।
স্বপন পাশে এসে দাঁড়াল এবং বলল— “কী নিয়ে ধ্যানে আছো বন্ধু?”
লেখক— “স্বপন, এসো, বস।”
স্বপন— “আজকের দিনটা মাটি হল। এমন বৃষ্টিতে গ্রামের চেহারা যা দাঁড়ায় তা ভদ্র লোকের জন্য জাহান্নামতুল্য। অবশ্য তুমি লেখক মানুষ। ধ্যানী, সৃজনশীল মানুষ। ভালোই লাগছে হয়তো।”
লেখক— “ধ্যানে তো বটেই। তুমি ঠিকই বলেছ। ও কে?”
স্বপন— “তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে এলাম। ওর নাম মিলি। আমার মামাতো বোন। অনার্স শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বাইরে যাবে।”
পৃষ্ঠা#০১
লেখক— “ভালো।’’
স্বপন— “দোস্ত! এবার তোরা কথা বল। শোন, তোর আসার সংবাদ পেয়েই মিলি গতকাল রাতেই চলে এসেছে। ওর সাহিত্যের প্রতি আলাদা একটা ঝোঁক আছে।”
মিলি— “আমি আপনাকে ভাই বলেই সম্বোধন করব, আপত্তি?”
লেখক— “আহা! তা থাকবে কেন? সবচেয়ে সহজ ও মধুর ডাক হল ভাই। আমি কিন্তু তোমার নাম ধরে ডাকব!”
মিলি— “অবশ্যই। স্বপন ভাই আমাকে নাম ধরেই ডাকেন। স্বপন ভাইকে ভাই বলে ডেকে থাকলেও আমি কিন্তু আপনাকে নাম ধরে ডাকতে পারি।”
লেখক— “তাই নাকি? কেন?”
মিলি— “এর কারণ হল– কেউ বড় হলে, সম্মানিত হলে তাঁকে ছোট-বড় সবাই নাম ধরে ডাকতে পারে।”
লেখক হেসে উত্তর দিল— “তবে বেশ! তাই ডেকো।”
লেখক স্বপনকে সম্বোধন করে বলল— “বোনটি বেশ লাস্যময়ী।”
আপাত দৃষ্টিতে মুখে যশ থাকলেও মিলি তার অন্তরের ঝাল মেটাতেই লেখকের সাথে দেখা করতে এসেছে। লেখকদের প্রতি মিলির একটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। প্রতিটি মানুষ তার জীবনকে একটা ছকের মধ্য দিয়ে চালিয়ে থাকে। এটা করলে ওটা হবে। অথবা ওটা না করলে এটা হবে না। এই তো জীবন। এটা সোজা বক্তব্য। তবে লেখকদের লেখার রসদ সংগ্রহের জন্য তাদের কেন প্রেম করতে হয় বা প্রেমে পড়তে হয়? কিংবা নানা সঙে সাজতে হয়?
এছাড়া আরও অনেক বিষয়ে মিলির কাছে হাস্যকর মনে হয়। বিয়ে হলে বাচ্চা হবে। বাচ্চা হলে খেতে দিতে হবে। খাবার রোজগারের জন্য পিতা-মাতার পরিশ্রম করতে হবে। এই, ঠিক এ-ই লিখলেই চলে। কিন্তু লেখকদের নানান বাড়াবাড়ি দেখে মিলির খুব রাগ হয়। এমন আরও প্রশ্ন নিয়ে মিলি বহুদিন ধরে প্রতীক্ষায় ছিল। অবশেষে সে একজন লেখককে খুঁজে পেয়েছে। তাই মিলি পণ করে এসেছে, এবার সে লেখককে জবরদস্তি করেই ছাড়বে।
মিলি— “চা খাবেন?”
লেখক— “চুপ থাকতেই ভালো লাগছে। তুমি আমাকে কিছু কী জিজ্ঞেস করতে চাও?”
মিলি— “আপনি কী করে বুঝলেন?”
লেখক মুচকি হেসে নীরব রইল।
মিলি বলল— “আচ্ছা, এবার বলুন তো– আমি কী প্রশ্ন করতে চাই?”
লেখক— “সেটা বলতে হলে পিছনের অনেক কিছু জানতে হবে। তবে মাথায় বিরাট একটা বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। তুমি তো জানোই, তোমার মনকে বিষিয়ে তুলেছে গুটি কয়েকটা প্রশ্ন বা যুক্তি। বলে ফেল, কী প্রশ্ন করতে চাও?”
মিলি— “আপনি অনেক সুন্দর করে কথা বলেন। গতকাল বিকালে শুনতে পেলাম, একজন লেখক মামার বাড়ি মানে স্বপন ভাইদের বাসায় আসবেন। তাই কালক্ষেপণ না করে রাতেই চলে এসেছি। লেখকদের সাথে কথা বলার ইচ্ছা বহুদিনের।”
লেখক— “কৌতূহলটা বেশ শক্ত বলে মনে হচ্ছে। আচ্ছা! এখন চা হলে মন্দ হয় না।”
মিলি— ‘‘আচ্ছা।’’
পৃষ্ঠা#০২
সাধারণত সবাই, আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির কণাকে, ঝর্ণার ধারাকে এমনকি চোখের জলকে বেদনার প্রতীক হিসেবেই প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এর আড়ালেও একটা আনন্দ থেকে যায়। আর একই বিষয়ের প্রতি শ্রেণি ভিত্তিক আলাদা আলাদা প্রভাব বা আমেজ থেকে থাকে। বৃষ্টির দিনগুলোতে শ্রমিকদের জীবন যেমন হয় অভাবনীয় কষ্টের, ঠিক তেমনি জমির মালিক যারা এর আগেই ফসল ঘরে তুলে নিয়েছেন, তাদের মুখে থাকে হাসি। তেমনি জেলেদের মনে থাকে খুশির আমেজ। সৌখিনদের জন্য বৃষ্টি উপভোগের বিষয় হয়ে থাকে। আর লেখকদের জন্য তা হয়ে ওঠে ভাবনার ও দর্শনের বিষয়।
ইতিমধ্যে মিলি র’চা নিয়ে উপস্থিত।
মিলি— “চা কেমন হয়েছে মন্তব্য চাই।”
লেখক— “এমন বাজে চা জীবনে একটিও খাইনি।”
মিলি— “প্রশ্নের উত্তর ভুল। দশে শূন্য পেয়েছেন। সঠিক উত্তর দিলে বোনাস নম্বর পেতেন।”
লেখক— “আমরা বাঙালি, তাই বোনাসের প্রতি লোভ রয়েছে। চা-টা সত্যিই অসাধারণ হয়েছে। প্রতি চুমুকেই তৃপ্তির স্বাদ পাচ্ছি। এই দেখ, শেষ অবধি পান করে নিয়েছি। এমন সুন্দর মুহূর্তে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। সেই সাথে তোমার জন্য একটা পুরস্কার আমার কাছে জমা রইল।”
মিলি— “গরম জিনিসের প্রতি আমার একটা আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।”
লেখক— “উপহার বাসি হোক তা আমিও চাই না।”
মিলি— “বোধগম্য হলো না।”
পৃষ্ঠা#০৩
লেখক উঠে গিয়ে রুম থেকে একটা কাগজ নিয়ে এল। কাগজের উপরের অংশে আঁকা ছিল— গাছপালা, একটি আঁকা-বাঁকা বয়ে চলা কাঁচা রাস্তা, দু’টি মানুষ, বাঘ, হাতি ও বন জঙ্গল। আর এর নিচে হাতে লেখা একটি কবিতা। কাগজের উপরে আঁকা ছবির পাশে অতি যত্নে কলম দিয়ে লিখে দিল–
‘উৎসর্গ,
প্রাঞ্জলা রূপসী মিলিকে।’
মিলি উপহার হাতে নিয়ে বলল— “টাটকা পুরস্কার পেয়ে আমি উচ্ছ্বসিত।”
এবং লেখকের আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে মিলি নাটকীয় ভঙ্গিমায় কবিতাটি আবৃত্তি শুরু করে দিল—

পথ
মুণ্ডুর উপর তুলোর বস্তা,
ছেলের হাতে ধরে চলল রাস্তা।
ঈষৎ কাদা পথে– জুতো নাই পায়ে,
আকাশে রোদ দেখে– প্রফুল্লে হাসে।
বিরাট বস্তা দেখে ভাবে ছেলে মনে মনে,
মস্ত বড় জোয়ান– আমার-ই বাপে।
হঠাৎ আকাশ জুড়ে মেঘ ডাকে!
ছেলে, অজানা আনন্দে নাচে;
আর বুড়ো– অশনি আশঙ্কায় কপালে ভাঁজ তুলে।
মাড়িয়ে পথ, ক্ষিপ্র বেগে ধায় বুড়ো!
এ কী লীলা–
মুহূর্তেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, আর বাতাস উড়ায় ধুলো।
গাছের শিকড়ে লেগে, হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় বুড়ো,
আর ওধারে তুলো!
গগন বিদীর্ণ চিৎকারে চিৎকার করে ওঠে ছেলে,
উড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বুড়ো।
এর কয়েক হাত দূরে সর্প দেখে বুড়ো,
ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে– ভয় পেয়ো নাকো!
আবার তুলোর বস্তা লয়ে চলে কিছু সামনে,
হঠাৎ রাস্তার উপর বাঘ এসে দাঁড়ায় আপন গর্জনে।
বাঘ তাকায় আগুন বর্ণে,
বুড়ো তাকায় আরও ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে।
হঠাৎ বজ্রের বিকট আওয়াজে
বাঘ দৌড়িয়ে পালায় দিকবিদিক ছুটে।
বুড়ো আর ছেলে প্রাণপনে ছুটে–
আর কোনো দিকে নাহি চেয়ে।
এবার বাঁচাও, এবার বাঁচাও– জপে জপে;
বাড়িতে পৌঁছাতেই গগনে রোদ ওঠে হেসে।
ছেলে কহে ভয়ার্তে– আর নাহি যাব ও পথে!
বাবা হেসে কহেন— তবে শোনো, ও পথ চিনবে কেমন করে?
পৃষ্ঠা#০৪
🌺 আরও দেখি- ছোটগল্প
মিলি— “আমি কিন্তু বুড়োর দলে।”
লেখক— “বোধগম্য হলো না।”
মিলি— “আমি ওই পথকে চিনতেই চাই।”
লেখক— “বুঝিয়ে বললে সুবিধা হয়।”
মিলি— “আমি আপনার প্রেমে পড়তে চাই। আর আপনি আমাকে পটাবেন।”
মিলির এমন মন্তব্যে লেখক উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। এমনকি তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মিলির দিকে ঝুঁকে গিয়ে লেখক বললেন— “পৃথিবীতে হরেকরকম মজা আছে। তন্মধ্যে এটি অন্যতম। প্রেম সবসময় অবাস্তবকে বাস্তব হিসেবে দেখা।”
অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মিলি আবার বলল— “আমি প্রেমে পড়তেই চাই। আর সেই ব্যক্তিটি একমাত্র আপনি।”
লেখক— “ওই গানটি শোনা হয়নি বুঝি, যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়।”
মিলি— “বহুবার শুনেছি। তবে আমি রসায়নে বিশ্বাস করি। সেই সাথে লেখককেও। তাই আপনাকেও।”
লেখক— “দাঁড়াও-দাঁড়াও, বিষয়টা বুঝেছি। কিন্তু তোমার এ চাওয়াটা বেশ গোলমেলে লাগছে।”
মিলি আবার দৃঢ়ভাবে উত্তর কেটে বলল— “এ তো খুবই সোজা কথা। আমি আপনার প্রেমে পড়তে চাই।”
লেখক— “বুঝিনি! কথাটা মাথার উপর দিয়ে গেল।”
মিলি— “আমাকে প্রেমে ফেলবেন, আর আমি আপনার প্রেমে পড়ব। ব্যাস!”
লেখক স্পষ্টতই বুঝতে পারলেন যে, তিনি একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। লেখকদের সম্পর্কে মিলির একটা বিশেষ কৌতূহল রয়েছে। লেখক বুঝতে পেলেন, কোনো ভাবে কেটে পড়বে নাকি একটু বাজিয়ে দেখবেন। মিলির দৃঢ়তায় এটা পরিষ্কার যে, লেখককে হেনেস্তা করার ফন্দি আঁটতেই এখানে এসেছে। লেখক পণ করলেন, কোনো ভাবেই পিছু হটা চলবে না। এর শেষটা দেখা উচিত।
লেখক কী যেন ভেবে হাসলেন। মিলি অনড় এবং নিজ অবস্থানে রয়ে গেল। লেখক কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি না হলেও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এমন সময় স্বপন আবার এসে বলল- “দোস্ত। চল্ খাবে। মিলি চল্।”
কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলেও লেখকের মনে কোনো একটা বিষয় ঘুরপাক খেলে চলল। ফ্রেশ হয়ে সবাই খেতে বসলেন।
পৃষ্ঠা#০৫
একটা বিষয় বাদ পড়েছে। লেখকের বন্ধু স্বপনের পরিবারে রয়েছে তার বাবা-মা আর এক বোন। বোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ও আসতে পারেনি । ওর বাবা-মা দুজনেই বন্ধু সুলভ মানুষ। স্বপনের এনগেজমেন্ট হয়েছে। এখনো নতুন বউকে ঘরে তুলে আনা হয় নি।
স্বপন— “বন্ধু, আমার খালাত বোন কিন্তু ভয়ানক দুষ্ট। আশা করি এরই মধ্যে কিছুটা বুঝতে পেরেছ।”
লেখক— “পুরোটা বুঝতে সময় লাগবে। আমি লেখক হিসেবে পথ শেষ না হতেই মন্তব্য করতে পারি না।”
ওদের অট্ট হাসিতে ঘরটা মুখর হয়ে উঠল।
স্বপনের বাবা— “বাবা, তোমার বউ আর মেয়ে কেমন আছে?”
লেখক— “সবাই ভালো। অফিস আবার লেখালেখি। তাই সময় দেওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে কিছুটা। মেয়ে বুঝে না, তাই কাঁদে। আর বউ বুঝে তাই ঝগড়া করে।”
স্বপন মুচকি হাসল। বাইরে বৃষ্টি থেমে রোদ উঠেছে। স্বপন ও লেখক দুজনেই খাবার খাওয়া শেষ করে শোবার ঘরে গিয়ে বসল। ‘বিয়েতে লজ্জা নেই’ এমন বিষয় নিয়ে মজার মজার কিছু অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান হল।
লেখক একপর্যায়ে বলল— “বিয়ের দলিল এমন একটা ব্যাপার যে, যেখানে একটি মেয়ের পূর্ণ অধিকার অর্জন করা হয়। দলিলে স্বাক্ষর হওয়ার পূর্বে যদি তার হাত ধরা হয়, তাহলে তখন নির্ঘাত মান হানি মামলায় পড়তে হবে। কিন্তু স্বাক্ষর হয়ে গেলে ঢাকঢোল পিটিয়ে দুজনকে এক রুমে প্রবেশ করানো হয়। কী মজা আর কী ভয়ানক, উফ! তারপর সারাজীবন একসাথে কাটবে। এটাই হল নিয়তি, নিয়ম। শান্তি।”
তার লাজুক বন্ধুটির মুখটা লাজে লাল হয়ে উঠে শুধু ঠোঁট চিরে ঝকঝকে দাঁত বের করে করে হাসলো। বিয়ের ক্ষেত্রে, বিয়ের আগেও প্রার্থনা করতে হয়। একই ভাবে বিয়ের পরে শান্তির জন্যও প্রার্থনাতে লিপ্ত থাকতে হয়। বিয়েটা মূলত পরিস্কার পাত্রে দুধ রাখার মত। অপবিত্র হলে দুধ যেমন নষ্ট হয়ে যায় ঠিক তেমনটাই। মানুষ পরিপক্ক হলেই তার বিয়ে করতে হয়। এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। সবাই সংসার করে। তবে কথা হল, প্রকৃতপক্ষে সবাই কী সংসার করে? বিবাহ বন্ধনের সময় সকল শর্তগুলোই মেনে বিয়ে করে থাকেন। সংসারের সকল সুবিধা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু যে সম্পর্কের জন্য সংসার বাঁধা হয়, আজকাল সেই সম্পর্কটাই তো বিলীন হওয়ার পথে। তবে কেন এ আনুষ্ঠানিকতা। লেখক চোখ বন্ধ করে এসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে লাগলেন।
ওদের মাঝে নীরবতা নেমে এলো। স্বপন ঘুমিয়ে পড়েছে। লেখকের ঘুম ঘুম ভাব এলেও সে উঠে দাঁড়াল। বাড়ির পাশে একটি পুকুর ছিল। এ পুকুরটি নানান ফলজ গাছে পরিবেষ্টিত। ওদিকটা লেখকের মনোযোগকে আকর্ষণ করল। লেখক এ ঘর পার হয়ে ও ঘরে অর্থাৎ বাইরে বাড়ির সামনে দিয়ে যেতেই মিলির দেখা মিলল। কাঠের বেঞ্চির উপর গা এলিয়ে বসে গল্পের বই পড়ছে। হাতের ইশারায় লেখককে ডেকে নিল। এমন সময় হঠাৎ করেই আবার মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
লেখক— “মেয়ে আর প্রকৃতি পরস্পর পাশাপাশি বসবাস করে। এ দুটির মাঝে কান্না একবার শুরু হলে আর থামতেই চায় না।”
পৃষ্ঠা#০৬
মিলি— “এটা কিন্তু বেশি হল।”
লেখক যা বলেছেন, এর বেশি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই আর কিছু না বলে মুচকি হেসে উড়িয়ে দিলেন।
ক্ষণকাল পরে মিলি জিজ্ঞেস করল— “বৃষ্টি প্রকৃতিকে উদাস করে তোলে।”
লেখক— “বটে। সাথে ঘুমের জন্যও বেশ উপযোগী।”
মিলি— “সবই বোঝেন, তবে কেন সব উড়িয়ে দিচ্ছেন।”
লেখক— “আগুনের বর্ণ সুন্দর। এর উপকারিতা বলে শেষ করা শক্ত। কিন্তু যে ছোঁবে সে পুড়ে ভস্ম হবে। সব কিছু নিয়ে খেলা চলে না। বাজি চলে না।”
মিলি— “আমি ওটার স্বাদ নিতে চাই.
অনুমানে নাহি নেব স্বাদ,
পুড়বো বলে পণ করেছি তবেই হোক মোর সঠিক জাত।
ফেরাওনা হেরি— যেন কারণ দর্শনে,
বৃক্ষ মালা স্বাক্ষী মোর অনুবৃন্তে।’’
লেখক আরও স্পষ্ট হলেন যে, হেনস্তা করার নিমিত্তে মিলি নেমে পড়েছে। ওর, লিখনী সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে। আরও পাকাপোক্ত হতে চায়, যেন জানা বিষয়গুলোর প্রতি আরও বিশ্বস্ততা বাড়ে। এখন সাবধান হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই । মিলি তার গল্পের বই থেকে একটা কাগজ বের করে লেখকের দিকে এগিয়ে দিল। কাগজে লেখা ছিল একটি কবিতা— এমন—
ঋষি
আমার মনের কথা বলতে পারি না,
সে কথাটা বাইরে আসতে চায়।
কে যেন হেথা– সর্ব শক্তি দিয়ে টেনে ধরে;
দাপড়ে দাপড়ে মরে সে কথা;
কেন সে দিল না ছাড়ি— মন তা আজ জানতে চায়।
পৃষ্ঠা#০৭
খাঁচার শক্ত দেয়ালে আটকে!
হায়! সে কথা–
জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুললো,
মুক্তির জন্য ব্যাকুল করল,
তবুও সে স্থান ছাড়ল না!–
কেন এমন হয়? মন আজ জানতে চায়!
বুঝি–
সহজ সে কথা– ভালোবাসি।
সমর্পণের সে কথা– ভালোবাসি।
মায়া ভরা সে কথা– ভালোবাসি।
অধিকার আদায়ের কথা– ভালোবাসি।
মুক্তির সে কথা– ভালোবাসি।
তবুও সে ছাড়ল না সে কথা।
মন আজ জানতে চায়— ‘সে কত বড় ঋষি?’
লেখক একমতো বীতশ্রদ্ধ হয়েই নীরব রাগে কাগজটি জব্দ করে অপর প্রান্তে গজ গজ করে একটি কবিতা লিখে দিলেন। সেই সাথে কাগজটির ঠিক উপরে ডান পাশে লিখে দিলেন— ‘কবিতাটি মিলিকে উৎসর্গ করিলাম।’ দেওয়ার সময় মিলিকে বললেন– “মন স্থির হলে পড়ে নিও। অশান্ত হৃদয়ে অনুভূতিগুলোও অশান্ত থাকে।”
মিলি— “আমি বাড়ি থেকেই স্থির করে এসেছি। অনুমতি পেলে এখনই পড়তে চাই।”
লেখক চুপটি করে রইলেন। অব্যক্ত এক আশ্বাসে মিলি কাগজটি খুলে দেখল। তাতে লেখা ছিল—
ইনসুরেন্স
উপলব্ধি
সত্যিই কি ভালোবাসায় মুক্তি,
বিহঙ্গ, জ্যোতির্ময়, প্রাণ শক্তি।
ভালোবাসা, বিষাদ করেছে মন,
এর বেশি জাগে ডেকে মরণ!
ধরে না কেন, বুঝে না সে,
মোর শ্রাবণ লয়ে মুক্তি দিতে পারে।
পৃষ্ঠা#০৮
🌺 আরও দেখি- আর্ট
যুক্তি
ভালোবাসায় বিরাট অনুভূতি,
দিতে পারে বেঁধে এ আকুতি।
লড়াকু ষাড়ের ওই ধারালো শিংয়ে,
অথবা শান্তিময় সাদা পায়রার পায়ে।
চুকে গেল, মিটে গেল, দাওয়াত পৌঁছাল।
পারবে কী সে– মনই যার শক্তি;
সংসার উড়িয়ে দিয়ে খুঁজে মুক্তি?
হেথায় বিরাট নেশা– জানো হে,
দায়িত্ব আরও পরম করে তুলে?
পরিণাম
আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ কী মায়ার সাজে,
নদীর বুকে চিকন ঢেউয়ে ঝিলিমিলি করে।
তাতে ভাসিয়ে দিলাম মোর ভালোবাসার চিঠি,
হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতি— আসে মুক্তি।
যত হিমেল বায়ু অথবা হাসনাহেনার ঘ্রাণ,
উদাস করে– এমন কী আর সইতে পারে?
নৌকা দোলে হেলে দোলে; তবুও বৈঠা হাতে বয়।
নির্ভুলে চলে সংসার— তাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হতে হয় সঠিক-এ।
লেখক ভেবেছিল মিলি বিষয়টা উপলব্ধিপূর্বক ক্ষান্ত দেবে। তার পাগলামির যবনিকা টানবে। কিন্তু বিষয়টাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল– “আজকের আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। মেঘটা অহেতুক হলেও কী এত সহজে মেঘ সরে গিয়ে রোদ ওঠে?”
লেখক খানিকটা শব্দ করে বলে উঠল—
“তুমি কি চাও।’’
পৃষ্ঠা#০৯
মিলি উঠে দাঁড়াল। লেখক মিলিকে বসতে বললেন– “মিলি, তুমি বুদ্ধিমান। বুঝতে চেষ্টা কর।”
মিলি জবাবে বলল— “আমার বড় সাধ ছিল লেখকের প্রেমে পড়ার। আমি আপনার প্রেমে পড়তেই চাই।”
লেখক হেসে উত্তর কাটলেন— “কেন?”
মিলি— “ভয় পেয়েছেন?”
লেখক— “হেয়ালি ছাড়। বল কেন?”
মিলি— “আপনার অনুভূতি চুরি করতে চাই। বলতে পারেন, কবি মনের লোকায়িত শক্তি যা একজন কবিকে বিকশিত করে তুলে, তা দেখতে চাই।”
লেখক— “এ তো সহজ কাজ। দু’একটা বই আর কিছু যৌক্তিক অনুমান করলেই পাওয়া যাবে। তবে প্রেমের প্রস্তাব কেন?”
মিলি— “হাতের কাছে ল্যাব থাকতে পুস্তককে কোনো বিশ্বাস করব?”
মিলির ধারণা লেখক মাত্রই প্রেমিক হয়ে থাকেন। আর যদি তাই না হতেন তবে তারা লেখনিতে এত সুন্দর করে কীভাবে উপস্থাপন করে থাকেন। লেখকরা আবার পাষাণও হয়ে থাকেন। এমন ঘটনার জন্ম দেন যেন পাঠক সমাজ তা পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অন্য দিকে লেখক তা উপভোগ করেন। সাধারণ মানুষ দেখেন ভিন্নতর চোখে। তাদের সাথে নির্জীব বস্তুটিও কথা বলে। মিলি এই আকণ্ঠ অনুভূতির রহস্যগুলো জানতে চায়।
অন্য দিকে লেখক জানে, প্রেম নিয়ে খেলা বা বাজি চলে না। এটা এমন এক অনুভূতির জন্ম দেয় যা, মানুষকে ফতুর করে তোলে। এই ভিখারী দশা থেকে মৃত্যুই একমাত্র মুক্তি দিতে পারে। তবে অনেকেই মনে করে মৃত্যুতেও এর বিনাশ নেই। ইহকালের অপূর্ণতা পরকালে গিয়ে পূর্ণতা পায়। মন একবার হারিয়ে গেলে তা আর কখনোই খাঁচায় ফিরে আসে না। লেখক মিলিকে তাই বারেবার বুঝাতে চেষ্টা করলেন।
অনেকেই মনে করেন ভালোবাসার অপূর্ণতা ইহকালের পূর্ণতা না পেলেও পরকালে পূর্ণতা পাবে। প্রকৃতপক্ষে এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তাছাড়া মন একবার হারিয়ে গেলে তা আর কখনও খাঁচায় ফিরে আসে না। লেখক আবারও মিলিকে এ কথাটাই বুঝাতে চেষ্টা করলেন।
লেখক— “প্রেম নিয়ে জেদ চলে না। মন কেবল দোল খেলে আমৃত্যু দোলায়।”
মিলি— “তবুও পড়ব। আমি প্রেমে পড়তে চাই। আমি জানতে চাই।”
লেখক হেসে বললেন– “যদি কখনো সত্যিই তোমার প্রেমে পড়ে যাই– তখন? আর মনকে ফিরে আনতে পারা গেল না।”
মিলি— “সে তো সহজ?”
লেখক আবার প্রশ্ন করল— “সত্যিই কী সহজ?”
পৃষ্ঠা#১০
টিনের চালে পড়া বৃষ্টির ধারা মিলি তার হাতের উপরে ফেলে এক রকম অদ্ভুত আওয়াজ সৃষ্টি করছে যা সত্যিই আনন্দের। সেই সাথে পানির কণাগুলো ছিটে পড়ছে অন্যত্র। মিলি কিছু বলতে উদ্যত হলে লেখক মিলিকে থামিয়ে দিয়ে বলল— “বৃষ্টির এই শীতল পানি থেকে তুমি কী মায়ার অনুভূতি নিতে চাও?”
বৃষ্টির পানি হাতে নিয়ে মিলি বলল— “এই তো নিচ্ছি।”
লেখক— “এভাবে সাধারণ মানুষের অনুভূতি পেয়েছো, কিন্তু লেখকদের মতো করে পেয়েছো কী?”
মিলির কৌতূহলী চোখ আনন্দে ভরে উঠল। মিলে লেখককে অনুরোধ করতে লাগল। লেখক তাতে রাজি হয়ে বললেন—
“হাত প্রশস্ত করে হাতের তালুতে আবার বৃষ্টির ধারা ফেল। পানির দুই-একটা ছিটে ফোঁটা তোমার গায়ে এসেও যেন পড়ে যেন।”
মিলি ঠিক তাই করল। —“তারপর।”
লেখক— “এবার চোখ বন্ধ করে বিরাট দম নাও। দম চেপে ধরে রেখে হালকা করে ছাড়বে।”
মিলি— “তারপর।”
লেখক— “তোমার সমস্ত ইন্দ্রীয় সজাগ করে রেখে মনোযোগটা রাখবে হাতের ওই তালুর উপর।”
মিলি— “হুম।”
লেখক— “মনোযোগ আরও বৃদ্ধি করো। এবার ভাবতে থাকো। কোনো কিছু পেয়েছো কি না?”
মিলি— “না।”
লেখক গাঢ় ভাবে মিলিকে আবার বলল— “মিলি, কিছু কী ঠাহর করে উঠতে পেরেছ? তোমার সমস্ত অঙ্গ শীতল হয়ে এক রকম স্নিগ্ধ অনুভূতি জুড়ে দিয়ে মাতাল করে তুলছে কী? গায়ের শিরদাঁড়াগুলো শীতে টনটন করে উঠছে কী?”
মিলি হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চমকানোর মত উঠে পেছনে থাকা বেঞ্চির উপর ধপাস করে বসে পড়ল। মিলি দেখতে পেল, তার গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গায়ে থাকা ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে আবার গায়ে জড়ালো।
লেখক জানতেন, এমন একটা প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। তবে প্রতিক্রিয়ার মাত্রাটা এত বড় হবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। মিলির দিকে আর ফিরে তাকাতে পারলেন না। মিলি জড়সড় হয়ে বসে রইল। শুধু লেখকের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিল। কোনো কথা বলল না আর। লেখক, বৃষ্টিতে নেমে পড়ল। বৃষ্টির টিপটিপ আওয়াজ, গাছের ভেজা পাতার স্পর্শ, পুকুর পাড়ে থাকা নারিকেল গাছের শব্দ। এরপর সে কাঁঠাল গাছের তলে এসে দাঁড়াল। অবশেষে আধ ঘণ্টা পার করে আবার ফিরে এলো।
মিলি সহজেই বুঝতে পেরেছে যে, লেখকরা অনুভূতির যে উচ্চতায় বিচরণ করেন তা সাধারণ মানুষের পক্ষে ছোঁয়া বা উপলব্ধি করা অত্যন্ত দুর্বোধ্য।
লেখকগণ তাদের লেখা অনুভূতি বা বিচরণগুলো সর্বসাধারণের বোধগম্যের করার জন্য তা অতি সাধারণভাবে যুক্তি, কর্ম উপস্থাপন করে থাকেন। মিলি যে বৃষ্টির পানির অনুভূতি বা উপলব্ধি সহ্য করতে পেল না, অথচ লেখক সেই অনুভূতিই উপলব্ধিপূর্বক বৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় ধরে ভিজে গ্রামীণ পরিবেশের স্বাদ আচ্ছাদন করলেন।
দুপুর হয়ে এসেছে। বাইরে হালকা রোদ। স্বপন পুকুরে গোসল করতে গিয়েছে। আর লেখক বিছানার পা এলিয়ে রেখে খাটের ছাউনির সাথে মাথা হেলান দিয়ে একাদশ শ্রেণীর বাংলা বইটি মনোযোগ দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখছিলেন। তার মনোযোগ মূলত গল্প-কবিতার শ্রুতিমধুরতা, বিরাম চিহ্নের ব্যবহার, কিছু শব্দার্থ ইত্যাদি প্রতি। এমন সময় মিলি নীল রঙের জর্জেট জামা পড়ে স্বভাবসুলভ হাস্যোজ্জ্বল রূপে প্রবেশ করল। এবং বলল, “শুভ দুপুর।”
লেখক— “এসো। বসো। শুভ দুপুর।”
মিলি তার হাতের মুষ্টি থেকে একটি কবিতা বের করে নিল। পড়ার টেবিলের পাশে থাকা চেয়ারের উপর বসে আবৃত্তি শুরু করে দেবে, ঠিক এমন সময় স্বপন রুমে প্রবেশ করল। স্বপন দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে শ্রোতার বেশে খাটের উপর এসে বসল। মিলি স্বভাবসুলভভাবে মুখে মৃদু হাসির রেখা নিয়ে হাত উড়িয়ে আবৃত্তি করতে লাগল—
“প্রাণ তব প্রাণ
ধর আমার হাত,
বুঝলে কিছু? পেলে?
মুণ্ডু নাড়াও।
—আচ্ছা বাদ দাও।
লেখক ইতস্তত হয়ে টেবিলের উপর কী যেন খুঁজে দেখলেন কিন্তু পেলেন না। স্বপন কিছু একটা বুঝে নিল। আর বললেন— “তারপর।”
চোখে রাখ চোখ
—কী? পেলে কিছু? বুঝলে?
—কালো, গোল, তার পাশে সাদা।
ও বুঝেছি আর কিছু দেখনি?
—ঠিক আছে।
দেখ মোর ওষ্ঠ,
কম্পন করে? বুঝ হে?
কথা বলছি বলে দাপড়ায়,
তাই নাহি বুঝ অনুমানে।
—থাক তবে।
পৃষ্ঠা#১১
🌺 আরও দেখি- উপন্যাস
আমার বুকে রাখ তোমার কান,
—কী বুঝলে? কান্নার আওয়াজ পাও?
নাকি হৃদপিণ্ডে টিপটিপ আওয়াজ বিনে
—সবই উধাও।
প্রাণ বোঝলে না প্রাণের কথা,
ঠিক আছে– তবে থাক।”
স্বপন হাতে তালি দিয়ে উঠে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। অন্যদিকে মিলি মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
মিলি— “কবিতা আবৃত্তি করতে পারি না, তাই বলে একটা ধন্যবাদও তো পেতে পারি না।”
লেখক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন ঠিকই কিন্তু তা আর কোনো প্রয়োজনে আসে নি। ক্ষোভটা মিলি তার নিজের মধ্যে কৌশলে ধরে রেখে মুখে কৃত্রিম হাসি নিয়ে রুম ত্যাগ করল।
দুপুরে খাবারের টেবিলে মিলি এলো না। নোটিশ করেছে, সে অসুস্থ; তাই শুয়ে আছে। সে পরে খাবে। অন্যায়কারীর আত্মা প্রায়শ্চিত্তের জন্য সর্বদা জাগ্রত থাকে। কেউ বুঝুক আর না-ই বুঝুক, লেখকের বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না যে, কোনো এক অভিমানের মেঘ জমাট বেঁধেছে। স্বপনের মা লেখককে উদ্দেশ্য করে বললেন—
“বাবা এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? শহরের মানুষ। গ্রামে…”
লেখক বাকি কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বরং বললেন— “না না কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। বরং খুবই উপভোগ করছি। সুযোগ পেলে আবার চলে আসব।”
স্বপনের বাবা— “বেশ, চলে আসবে। আমরা খুশি হব। বুঝলে বাবা, আমার জীবনে অনেক বই পড়েছি। কিন্তু সারা জীবন একটা লাইনও লিখতে পারিনি। তবে এ কথা সত্যি যে আমি ভালো চিঠি লিখতে পারতাম। কী বল, স্বপনের মা?”
মুখের সামনে আঁচল টেনে লাজ নিয়ে বললেন— “কী যে কোথায় বলো! ছি ছি ছি…”
স্বপনের বাবা আবেগটাকে ধরে রাখতে পারলেন না। অট্টহাসিতে আজকের দুপুরটা সার্থক হয়ে উঠল।
পৃষ্ঠা#১২
একজন বাদক যে বাঁশি বাজায়, সেই বাঁশির সুরে বাদকের কান্না এলেও তিনি বাঁশিটি তাঁর নিজের কাছেই রাখতে চায়। আর এটাই হল— মায়া। দুপুর পেরিয়ে গেলেও মিলিকে দেখা গেল না। বিকেলবেলায় স্বপনের সাথে লেখকের গ্রামের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর কথা ছিল। লেখক সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন প্রায়, সে ঘুরতে যেতে চায় না। কিন্তু কী যেন ক্ষোভ থেকে তাকে তা করতে দিল না। সরু ও সুন্দর কাঁচা মাটির পথের শেষ প্রান্তে একটি গ্রামীণ বাজার। রাস্তাটি প্রায় দেড় মাইল দীর্ঘ হবে হয়তো। দু’ধারে অবারিত সবুজ মাঠ, মাটির ঘ্রাণ, আকাশে রোদ আর মেঘের ছায়ার খেলা। পায়ে জড়িয়ে গিয়েছে কাদা মাটি। এমন মাতোয়ারা পরিবেশে লেখক যেন ডুবে গেলেন এক গ্রামীণ সতেজ মুগ্ধতায় ঘেরা সমুদ্রের মাঝে। তিনি যেন আপন অনুভূতির শস্য সংগ্রহে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন।
আকাশে দমকা দমকা কালো কালো মেঘ। সূর্যের ক্ষীণ আলো। ভেজা গাছপালা। ভেজা মাটি। এই বুঝি বৃষ্টি নেমে আসে— এমন এক আবহ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে কাঁচা রাস্তা পার হওয়ার সময় লেখক স্বপনকে থামিয়ে দিলেন। লেখক রাস্তার কিনারায় থাকা দুর্বা ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টেনে নির্মল বায়ুতে ফুসফুস ভরে তুললেন। ভিতরের দূষিত বায়ু বার করে বিশুদ্ধ বায়ুতে পূর্ণ করে নিলেন যেন। এ প্রশান্তিটুকু বরং তার মনে এক নির্মল তৃপ্তি এনে দিল।
দূর থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে বাজার সন্নিকটেই। একটা ভারি আওয়াজ বাতাসে ভেসে আসছে। বাজার হল গ্রামের লোকদের মিলনমেলার পাশাপাশি পুরো সপ্তাহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগান বা চাহিদা মিটাবার স্থান। শহরের বাজারগুলোর মত চাকচিক্য না থাকলেও লোকের উপস্থিতি প্রায় সমান। বেশির ভাগ লোকজনের কোমরে লুঙ্গি গুজানো এবং একেবারে পুরোনো জামা গায়ে জড়ানো। কিছু ব্যক্তির কাঁধে আর কিছু ব্যক্তি কোমরে গামছা বাঁধা। গুটিকয়েক জনের পায়ে প্লাস্টিকের জুতা থাকলেও কাদায় এমন বেহাল দশা। এরা সবাই ব্যাগ অথবা ডালা নিয়ে অল্প পরিমাণ করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করছে। খাদ্যদ্রব্যের অধিকাংশই তাদের স্থানীয় মাঠে জন্মানো এবং সতেজ।
স্বপন বেশ সংকোচের সাথেই লেখককে আমন্ত্রণ জানালেন মিষ্টির শিরায় দিয়ে পাউরুটি খেতে। লেখক উৎসাহ ভরে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। লেখক বুঝতে পেলেন, মিষ্টিগুলো শহরের মত এতটা নরম নয় কিন্তু মিষ্টি পাউরুটি সংমিশ্রণের স্বাদটা চমৎকার। কিছুটা আনমনে হয়ে লেখকে বললেন— “নবনিতা আর মেয়েটাকে যদি আনতে পারতাম।”
(নবনিতা লেখকের স্ত্রীর নাম)
স্বপন— “হু! ওরা আনন্দ পেতো।”
বাজার-সদাই ছিল অল্প পরিমাণে কিন্তু দুই বন্ধু মিলে পুরো বাজার ঘুরে ঘুরে দেখল। পান-সুপারি, মাছ, তরিতরকারি, ধান-পাট, মুরগিসহ আরও নানান রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে উঠেছে। স্বপন বাজার থেকে যা যা কিনেছেন তার তিনগুণ দাম দিয়ে হলেও শহরে সেই পরিমাণ পণ্য পাওয়া যেতো না। ছোট দেশি মাছগুলো তখনও ঝাঁকির ঢাকনার উপর লাফাচ্ছে। এটা দেখে লেখকের ইচ্ছে হলো– সবগুলো মাছ কিনে নিতে। শহরে থাকলে যেমন প্রায়ই করতেন। কিন্তু লেখক পরক্ষণেই ভাবলেন— সব কিছু ভাগাভাগি করে চলাটাই হল গ্রামের সম্প্রীতি।
বাড়ি পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। হাত-পায়ের যা অবস্থা দাঁড়াল তা যদি নবনিতা দেখতে পেত, তবে এ ভরসন্ধ্যাবেলায় গোসল বিনা মুক্তি ছিল না। এখানে নবনিতা নেই, কাজেই দিব্যি হাত-মুখ ধুয়ে শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন।
পৃষ্ঠা#১৩
লেখক ক্লান্ত শরীরে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে রইলেন। দুচোখ বুজে রেখে সেই ফেলে আসা সময়গুলোকে নিয়ে ভাবছেন। এমন সময় কৃত্রিম শব্দ করে মিলি রুমে ঢুকে পড়ল। কিছু বলতে না বলতেই পাশে থাকা চেয়ারে এসে বসল। লেখক মিলির দিকে তাকালেন বটে কিন্তু কোনো কথা বললেন না আর। সে আবার চোখ বন্ধ করে আপন ঢঙে বসে রইল, আর ভাবতে থাকলেন। এমন সময় মিলি একটি কবিতা আবৃত্তি শুরু করে দিল—
সমর্পণ
“অনুভূতি গোপনই থাক,
চাওয়াটা সামনে আসুক।
অনুভূতি হলো শক্তি আর—
চাওয়াটা আন্দোলনের মুখ।”
লেখক চোখ খুলে সোজা করে বসে কিছুটা বিষণ্ন হয়ে বললেন— “মিলি, লেখক অনুসন্ধানে নামো না। শেষ অবধি সইতে পারবে না। করুণ পরিণতি ডেকে আনবে।”
মিলির সাবলীল উত্তর— “আমি সুপ্ত খনির অনুসন্ধানেই নেমেছি। না-হয় হলাম সন্ন্যাসী।
কী যে খুঁজে বেড়াই— জানি নে,
কী যে আঁকি, বুঝি নে।
চাওয়াটা প্রখরতর—
এর শেষ কোথায়, খুঁজে পাইনে।
সত্যি বলতে কী জানেন— লেখকরা হয়তো আয়নার মতো। কেউ সামনে এলে তার মনের ভেতরকার কথাগুলো দেখতে পান।
উড়ে দিতে ইচ্ছে জাগে—
শূন্য হয়ে থাকতে।
কখনও ইচ্ছে জাগে—
পাখির পায়ে, ভ্রমরের গলে,
ওই আকাশে সাদা মেঘের ভেলায়,
অথবা অগ্রাণ বায়ুর অগ্রে।
“আমি যদি পারতাম তবে উড়িয়ে দিতাম…”
লেখক বললে— “সত্যিই পারতে?”
মিলি— “আগে বললে হয়তো পারতাম না; তবে এখন, মন বলছে পারব।
পৃষ্ঠা#১৪
আমার-ই আশে তুমি করিছ খেলা,
লহ মোরে লুটে, নাকি মনে অন্য রেখো?”
লেখক উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। মিলি জিজ্ঞেস করল– “আপনি হাসলেন কেন?”
লেখক– “শেষ দুই লাইন এই কবিতার নয়,”
মিলি লাজ আর হাসির সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় ওঠে দৌড়ে পালাতে লাগল। দরজা পার হওয়ার সময় স্বপনের সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে যায় এমন। স্বপন ইতস্তত অবস্থায় ওদের হাসি দেখে সেও হেসে উঠলেন। এমন পরিস্থিতিতে সে কী বলবে তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
জিজ্ঞেস করলেন– “কী হয়েছে, দৌড়াদৌড়ি কেন?”
লেখক বললেন– “মিলি ভুল আবৃত্তি করেছে।”
মিলি– “একদমই না।”
লেখক– “তবে কবিতার শেষ দুই লাইন আবার আবৃত্তি করে শোনাও।”
স্বপনের অনুরোধ– “মিলি, শোনা তবে।”
মিলি– “বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।” এই বলে হনহন করে চলে গেল। রুমটাতে এক অদ্ভুত অট্ট হাসির মাতন ভরে উঠল।
স্বপন– “কী বন্ধু! গ্রামে এসে সাহিত্যের কোনো রসদ পেলে?”
লেখক–“হুম! সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা অনুভব করছি, তা হলো– যেন আমার আয়ু বেড়ে গিয়েছে।”
স্বপন– “তাহলে ঘন ঘন গ্রামে চলে আসবি।”
লেখক– “কিন্তু লাভ নেই তাতে।”
স্বপন কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বললেন— “কেন?”
লেখক— “জন্ম ও মৃত্যু একটা সময়ের বলয়ে ঘেরা। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
স্বপন– “ঠিক বলেছ। এটা নিয়ে অনেকেই হেলাফেলা করে। কিন্তু বিষয়টা ধ্রুব সত্য।”
লেখক– “তুমি এমন কাউকে কখনও দেখেছ মৃত্যুর আগে চৌদ্দ-পনের দিন না খেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় বিছানায় পড়ে থেকে বেঁচে থাকতে। এমনও হয়েছে, সে শুধু আঙুল পানিতে ভিজিয়ে জিহ্বা অথবা ঠোঁট স্পর্শ করে বেঁচে আছে। আর আমরা যারা সুস্থ রয়েছি, তারা এতদিন না খেয়ে থাকার কথা আমরা চিন্তাই করতে পারি না।”
পৃষ্ঠা#১৫
স্বপন– “ হ্যাঁ! এটাই হলো রিজিক আর আয়ুর সীমারেখা।”
লেখক– “এটাই ভাববার বিষয়। এ বিষয়ে মানুষের বিবেক অনুপস্থিতির কারণে পৃথিবী প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।”
লেখক সম্মতিসূচক একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন।
কিছুক্ষণ মৌন থাকার পর লেখক ফিনকি হেসে বললেন– “ভয়ে রয়েছি। যেভাবে সব চুরি হয়ে যাচ্ছে।”
দু’জনেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।
স্বপন– “ভয় নেই। সবগুলো পাণ্ডুলিপি ফেরত দেবে।”
রাতে খাবার খাওয়া শেষ হল। দিনের ধকলটা বেশ ছিল। আজ তাই ওরা ক্লান্ত। এই শীতল রাতে বেশি রাত না জেগে ওরা শুয়ে পড়ল। কিন্তু সবসময়ই অনুসন্ধানী মন চোখকে বিশ্রাম নিতে দেয় না। স্বপন বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন। আর লেখক তখনও বিচক্ষণতার মঞ্চে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে যুক্তি খণ্ডন করতে নেমে পড়েছেন। যুক্তি অনুমান নয়, সত্য সন্ধান। যুক্তি শুধু মুক্তি নয়, বিজয়।
প্রেম কী ঘোর, নাকি ক্ষোভ, না লোভ? আর ঘোর মানে কী সর্বশান্ত হওয়া? আমি, এই আমি বলে কিছুই না থাকা। তবে কী ঘোর আত্মহত্যা? ক্ষোভ হলো রাগ/জেদ/বাজি। ক্ষোভ তবে কী তাই– কেউ গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিলো আর অন্যজনও প্রত্যুত্তরে কাদা মেখে দিলো। গণিতের সমীকরণের মতো উভয় পাশেই কী সমান? লোভ কেবলই স্বার্থ হাসিলের খেলা? এটা কী এক ভণ্ডামির ফাঁদ? যে ফাঁদে অধিকাংশেই পড়ে থাকে!
লেখক কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন, তা সে নিজেও জানেন না। ঘুম ভাঙল খোয়াড়ে বন্দি মোরগের ডাকে। সূর্য তখনও উঠেনি। গায়ে কাঁথা জড়িয়ে স্বপন শুয়ে আছেন। অনেক বছর ধরে লেখক গ্রামে সূর্য ওঠার দৃশ্য দেখেন না। তাই আজ এমন সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চায় না। তাছাড়া বর্তমানে যে গল্পটা লেখা শুরু করেছে তার জন্য হলেও প্রভাতের এই দৃশ্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক আগের দিন ঠিক করে রেখেছিলেন কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে এ অপূর্ব দৃশ্যটি উপভোগ করবেন।
বাইরের বাড়ির সামনে থাকা পুকুর, তার পাড় ঘেঁষে কয়েক পা দূরেই একটি উঁচু স্থান। সেখানে বড় গোছের নারিকেল গাছটা দক্ষিণ দিকে হেলে দাঁড়িয়ে আছে আপন সৌন্দর্য বিলিয়ে স্বমহীয়ায়। এরপর বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের শেষে অন্য গাঁয়ের পাড়াগুলো আঁধার থেকে বেরিয়ে আসছে।
আজ বৃষ্টিস্নাত ভোর। শীতল হাওয়া বইছে। খালি পায়ে নরম মাটির স্পর্শ আরও শীতল। এই শীতলতা মস্তিষ্কের উপরের অংশকে স্পন্দিত করছে। একদল পাখি আবছা অন্ধকার ঝোপের আড়াল থেকে কিচিরমিচির শব্দ করছে। পূব আকাশে লাল আভা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে কেবল। লেখক পা টিপেটিপে এগোতে লাগলেন। লেখকের প্রত্যাশা ছিল, সমস্ত অনুভূতি জাগ্রত করে প্রভাতের কোমল সূর্যালোকে স্নান করবে।
পুকুর পাড়ে ওঠেই দেখতে পেলেন, উঁচু স্থানটিতে মেয়েসদৃশ কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আরও কিছু দূর এগুতেই লেখকের বুঝতে আর কোনো অসুবিধাই হলো না যে, প্রকৃতপক্ষে সেই মেয়েটি কে। আরও সামনে গিয়ে লেখক যা দেখতে পেলেন, তা দেখে একেবারে বিস্মিত হলেন। এটাকে পাগলামি, ভালোবাসা নাকি কৌতূহল বলবেন, তা তিনি ভেবে পেল না।
পৃষ্ঠা#১৬
দু’হাত ঊর্ধ্বমুখে প্রসারিত করে মিলি এক ধ্যানে দাঁড়িয়ে আছে। পরনের ওড়নাটা পাশের মেহগনি গাছের সাথে বেঁধে রাখা আছে। লেখক মিলির ঠিক পেছনে গিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মিলির দুই বাহুর উপর দিয়ে দূর পানের ওই গ্রামের দমকা কালো ছায়ার মতো কালো রেখা ভেদ করে প্রভাতের রক্তজবা বরণ কোমল সূর্য উদিত হয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করার নিমিত্তে উঁকি দিচ্ছে। সেই সাথে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে মিষ্টি আলোয় মিলি তার নিজের দেহ ও মনকে ভিজিয়ে নিচ্ছে। মিলির এমন ধ্যানে ডুবে থাকার মগ্নতাকে লেখকের ব্যাঘাত ঘটালেন না। লেখক মিলির আরও কাছে গিয়ে ফিস্ফিস্ করে আওয়াজ করলেন–
“আমি তো স্বাধীন নই,
সর্বদাই আবৃত ও আচ্ছন্ন।
দেহ-মন লেপে আলো-আধারি;
কোথাও কী মুক্তি আছে
–হে অনুরাগী!”
মিলির বন্ধ দুচোখ কৌতূহলের তাড়নায় খুলে গেলো। দৃষ্টি পড়ল টকটকে লাল, কোমল সূর্যের দিকে। লেখক আবার বললেন–
“ঘুমাতে চাও–
গান গেয়ে দিব।
কান্না করতে চাও–
আরও ব্যথা দিব।
শুধু চেয়ো না–
অনুভূতি পাবে না।”
লেখক আরও এক পা এগিয়ে সামনে ঝুঁকে মিলির কানের কাছে গিয়ে বললেন– “ভালোবাসি।”
মিলি তখন ঘুরে দাঁড়াল এবং লেখকের চোখে চোখ রাখল।
তাদের দু’জনের মধ্যে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাগুলো শুধুই খেলা। যদিও খেলা তবুও এর মাঝে ভালো লাগা মিশে আছে। সেখানে আবেগ উপস্থিত আছে। স্বপ্নের জাল বোনা আছে।
লেখকের মুখে আস্থার সাথে অন্য কাউকে বলা– ভালোবাসি; তা একেবারেই অসম্ভব জেনেও মিলির মাঝে এক আশ্চর্য রকম ভালো লাগা কাজ করেছে। লেখকের স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাছাড়া মিলির শর্তই ছিল শুধুই লেখকের প্রেমে পড়া। সে প্রেমে কোনো প্রকার স্বপ্ন থাকবে না। আশা থাকবে না। পরিণতি কিংবা পরিণাম থাকবে না।
পৃষ্ঠা#১৭
দু’জনের চোখে চোখ পড়াতেই লজ্জায় লেখকের চোখ আড়ষ্ট হয়ে উঠল। অন্যদিকে মিলির চোখে-মুখে এক অজানা আনন্দের ঢেউ ফুটে উঠছে। সে আনন্দ ক্ষণিকের মধ্যে লজ্জাবতী লতাটির মতো লুকাতে চাইল কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না।
কারও মুখে কোনো কথা নেই। মিলি পুনরায় সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ালো। লেখক চুপিসারে সরে এলো। কিছুটা দূরে এসে দু’হাত তুড়ি দিয়ে মুখে একরকম অস্ফুট আওয়াজ করলেন। মিলি পিছন ফিরে তাকিয়ে লেখকের আনন্দ উদযাপন পরখ করল।
পৃথিবীর বুকে প্রতারণাপূর্ণ যত শব্দ রয়েছে, তান্মধ্যে ভালোবাসি শব্দটি হয়তো অন্যতম। তবুও সম্পর্ক উন্নতির সর্বোত্তম শব্দ এটিই। এর বড় একটি শক্তি রয়েছে। শব্দটি শুনে মিলি তার শর্তগুলো যেন এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল। লেখকও ক্ষণিকের ত্বরে ভুলে গিয়েছিল তার অবস্থান কোথায়।
লেখক আজ মহাখুশি। তার থাকবার ঘরে এসে দেখে স্বপন তখনও ঘুমিয়ে আছে। লেখক চেয়ারে এসে বসলেন। আবার উঠে গিয়ে জানালা খুলে দিলেন। গুপ্ত আনন্দে লেখক ঘরময় পায়চারি করতে লাগলেন। নিঃশব্দে কয়েকবার হাততালি দিলেন। মনের অজান্তে ‘বাহ!’ বলে আওয়াজ করে উঠলেন। সম-পরিমাণ ঠান্ডা পানি আর গরম পানি একই পাত্রে রাখা হলে গরম পানির প্রভাবটাই বেশি হয়। স্বপনও আর আরাম করে ঘুমাতে পারলেন না। ঘুমাতুর অবস্থায় সে লেখককে জিজ্ঞেস করলেন– “কী রে! এই সাতসকালে কী হলো তোর?”
–“যে রাধুনীর রাঁধে; যদি সে চেখে নিতে পারেন, তা রাঁধুনির জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক; বলতে পার?”
–“চমৎকার। নিজের কর্ম সম্পর্কে ভরসা বাড়ে।”
–“বন্ধু, আমার ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে।”
–“কেন? গল্প লেখা শেষ!”
– “হ্যাঁ! আচ্ছা, যমুনা নদীর শাখা নদীটা এখান থেকে কতদূর?”
–“এই তো কাছেই।”
–“হুঁ।”
লেখক অস্ফুট আনন্দ ও ভরসার তৃপ্তি নিয়ে চেয়ারে বসে রইলেন। গল্পটির পরিণতি কী হবে তা নিয়ে সে ভাবতে লাগলেন।
লেখক মূলত গ্রামে এসেছিলেন তার একটা গল্পের বাস্তব রূপ দিতে। প্রেক্ষাপট ছিল– ‘অসম প্রেম।’ এ গল্পের নায়ক– ‘সিধু’ বয়স– ‘তেইশ।’ আর নায়িকা– ‘এনি’ বয়স– ‘উনত্রিশ।’ সিধু দেখতে অত সুন্দর না হলেও খুব ভালো গল্পকথক। সেই সঙ্গে একজন ভালো শ্রোতা। বেশ পরিপাটি। পড়ালেখার সুবাদে তার শহরে যাতায়াত রয়েছে। এক কথায় তার সংঙ্গে ভদ্রসমাজের লোকজনের মিশতে পারে।
পৃষ্ঠা#১৮
অন্যদিকে এনি খুব আধুনিক। আধুনিক তার মন-মানসিকতা। বয়সকে কব্জা করে একুশ-বাইশে সীমাবদ্ধ রেখেছে। সব গোপন করা গেলেও পড়াশোনা তো আর গোপন করা যায় না। তাই বয়স সহজেই অনুমেয়। এখনো বিয়ে করেনি। বিয়ের প্রস্তাব যে আসে না, তা নয়। উড়ন্ত পাখি সবার চোখে একটু বেশিই পড়ে। এমন পাখি খাঁচায় পুরে নিজের করতে চাওয়ার ব্যক্তির সংখ্যা নেহায়েত কমও নয়।
এনি বিয়ের ক্ষেত্রে সব কিছু যদি ছেড়েও দেয়, সে একটা বিষয় ছেড়ে দিতে একেবারেই নারাজ। আর তা হলো– ‘সাহিত্য।’ তার মতে বাইরের চাকচিক্য, দৈহিক চাহিদার বিনাশ আছে। কিন্তু সাহিত্যজ্ঞানের বিনাশ নেই। সাহিত্য হলো মনের খোরাক। এই চোখ, এই অনুভূতি যা লুফে নেয়— তাই সাহিত্য। দু’হাত একত্রে মিলিত না হলে যেমন শব্দ হয় না, ঠিক তেমনি সাহিত্যের প্রতি মন না থাকলে তার সাথে মনের মিলন হয় না বলেই সে বিশ্বাস করে।
এনির শেকড় গ্রামে থাকলেও তার বাবার চাকরির সুবাদে তাদের শহরে বসবাস। এনির যদিও ভালো লাগে গ্রাম ও গ্রামের লোকজনের সরলতা এবং গ্রামের নির্মল পরিবেশ। তবে এনি কখনো ভাবেনি, এই গ্রামের ভেতর মনের কথা বলার মতো কিংবা মনের ভাবনা প্রকাশ করার মতো কাউকে খোঁজে পাবে।
লেখক তার উপন্যাসের নায়ক সিধু আর নায়িকা এনির সাথে কোনো এক ঘটনার প্রেক্ষিতে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। সেই সুবাদে তাদের মধ্যে আলাপচারিতা হয়। সাহিত্যানুরাগের সূত্রে পরিচয় হয়। ওরা দু’জনেই একসাথে বসে একই গল্প পড়া শেষ করলেও সিধুর দর্শনজ্ঞান এনির চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। গ্রামবাংলার আবহ নিয়ে যে লেখনিগুলো ওরা দু’জনে মিলে পড়েছে তার অধিকাংশই সিধুর বাস্তব জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া বা দেখা অথবা পথে-ঘাটে-মাঠে বাস্তবতার স্বাদ পাওয়া হয়েছে সেই ছোটবেলা থেকেই। অন্যদিকে, এনির মাঝেমধ্যে গ্রামে এলেও তার পড়া গল্পগুলোর পেছনের স্বাদটা অনেকটাই কাল্পনিক থেকে যায়।
যেমন, সিধুর গ্রামে একটা স্কুল রয়েছে। তার অদূরেই ধনী বাড়ি। স্কুলের মাঠ আর ধনী বাড়ির আঙিনার পাড় ঘেঁষে বড় একটি পুকুর রয়েছে। তার পাড় বেশ উঁচু। আর পুকুরের পাড় উঁচু রাখার প্রধান কারণ হলো বন্যার পানি। সেই স্কুলে পাঠদানের জন্য ভিনদেশী শিক্ষক রয়েছেন। মাঝেমধ্যে সিধু পুকুর পাড়ে এসে বসে নানান প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ভেবে থাকে। সে ভাবে, যদি তার প্রেম ভেঙে যেতো, যদি সে ভিনদেশী শিক্ষক হতো, যদি তার প্রেয়সী এ বাড়িগুলোতেই বিয়ে হতো, যদি বড় বন্যা হতো, যদি সব ভেসে যেত আর যদি সে রাত জোছনায় ভরা রাত হতো।
অন্যদিকে সিধুদের বাড়ির কাছেই জমিদার বাড়ি ছিল। সে ছোটবেলা থেকেই লোকমুখে শুনে এসেছে– জমিদারের একটি কন্যা ছিল। সে দেখতে পরীর মতো। মেয়েটি বেশ বিদ্যানুরাগী। তিনি দুটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বেশির ভাগ সময় সিধু জমিদার বাড়ির বারান্দায় বসে সাহিত্যচর্চা করে থাকে। চোখের ক্লান্তি দূর করার জন্য মাঝেমধ্যেই অদূরে বয়ে চলা মৃতপ্রায় শাখা নদীটির দিকে তাকিয়ে থাকে। এখান থেকে দেখা যায় নদীর পাড় ঘেঁষে মাঠ পেরিয়ে অন্য গ্রামের দমকা কালো রেখার ওপারে দূরের গগনখানি কীভাবে মিশে গিয়েছে। আরও দেখা যায়, আঁকা-বাঁকা ধুলো মাখা মাঠের পথ। এ পথেই রাখাল ছেলেরা ধুলো উড়িয়ে ছুটে যায় অন্য মাঠে, অন্য গাঁয়ের পথে।
পৃষ্ঠা#১৯
🌺 আরও দেখি- ছোটগল্প
🌺 আরও দেখি- কবিতা
🌺 আরও দেখি- আর্ট
🌺 আরও দেখি- উপন্যাস
এই যে আবহ বা ঘটনা কল্পনা করে হয়তো ভালো লেখনির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায়। কিন্তু নগদ অনুভূতির স্পর্শ অনুপস্থিত থাকে। এনি আর সিধুর সম্পর্ককে লেখক এমন এক পর্যায়ে দাঁড় করান, যেন তারা খাঁচাবন্দি পাখি। খাঁচাবন্দি পাখির ছটফটানি দেখে মনে হয় তার খাঁচা থেকে বের হওয়া অতি আবশ্যক; তাদের অনুপস্থিতির ফলে কে যেন মারা যাচ্ছে, এমন। অথবা সমস্ত পৃথিবী থেমে যাবে।
পাড়ার চক্ষুশূল লোকজন তাদের এই মাখামাখি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কখনও দিগন্ত জোড়া মাঠ ভেদ করা সবুজ ঘাসে আবৃত মেঠো পথ ধরে অকারণে পাশাপাশি হাঁটাহাঁটি। কখনও পুকুরপাড় থেকে একটু নিচু জায়গায় প্রকাণ্ড গাছের শিকড়ে বসে থাকা। আবার কখনও কাচারি ঘরের দুয়ারে বসে দিনের আলো বিলীন হওয়া অবধি বসে থাকা। আরও নানান জায়গায় তাদের কবুতরের মতো ঘুরতে দেখা যেত। এতে করে পাড়ায় বেশ কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। একদিন তো সিধুর বন্ধু আপেল বলেই ফেলল– “সিধু, তোর শহুরে আপু কেমন আছে রে?”
সিধু আর এনিকে যারা পরখ করেছেন তারাই দেখেছেন– ওরা দু’জনে মিলে চোখ বড় বড় করে তাকায়, দু’হাত ছুড়ে ছুড়ে আবার কখনও এক হাত দিয়ে অন্য হাতে আঘাত করে স্পষ্ট ও শুদ্ধ ভাষায় কতগুলো বুলি আওড়ায়। ঝিম ধরে মাটির দিকে চেয়ে বিষণ্নতায় বসে থাকে। আবার হাতে তালি দিয়ে হাসতে হাসতে এদিক-ওদিক হেলে গলে পড়ে। সিধুর দুঃসাহস না হলেও এনি সিধুর কাঁধে হাত চাপড়ায়। তাদের দেখা হলেই কী যেনো এক অদ্ভুত খেলা ও বিষাদ তাদের আবিষ্ট করে রাখে। —–০০০০০০২০
এনির পরিবার সেকেলে মানসিকতার নয়। তবুও সবার মনেতে পুলিশি ভাবনা কাজ করে থাকে। এনিকে একদিন তার দাদু স্পষ্ট করে কিছু না বললেও ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন যে, এনি আর সিধুর মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। সেদিন এনি তার দাদুর কাছে বিন্দুকে সিন্ধুর আসনে বসিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। সেদিন দাদুর কাছে নিজের বয়স প্রকাশ করতে কোনো কার্পণ্য করেনি। বয়সের তফাৎ দেখে দাদু কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।
সিধুর গায়ে দামি সেন্টের সুবাস নেই। দামি পোশাকও নেই। চেহারায় জেল্লা ভাব নেই। এনির সঙ্গে মানানসই ও নয়। তবুও সিধু এনির জীবনে অন্যতম প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছে। ক্ষেত্রবিশেষে এনির মুখে এ কথাও শোনা গিয়েছে যে, সিধু তার দেখা উত্তম পুরুষ।
লেখক তার গল্পে এ ঘটনায় বলতে চেয়েছেন- ‘জ্ঞান হল জ্যোতি। সেটা কোনো আলমারিতে যত্নে থাকুক আর অবহেলায় কর্দমায় থাকুক– তা আলো ছড়াবেই।’
লেখক তার উপন্যাস এভাবেই এগিয়ে নিয়েছেন। সিধুর সাহিত্য পড়ার পাশাপাশি লেখারও অভ্যাস রয়েছে। এক রাতে এনির ঘুম হলো না। চোখ বন্ধ করলেই কানে বাজে সিধুর অসাধারণ বচনগুলো। চোখে ভেসে ওঠে গাম্ভীর্যের তিক্ত অবয়ব। শুয়ে-বসে শেষরাতের দিকে ঘুম দিয়ে রাত্রিটা কোনোভাবে শেষ করে প্রভাতেই সিধুর বাড়ি হাজির হল। এনি দেখে, সিধুর শোবার ঘরের দরজা খোলা। এনি ঘরে ঢুকে দেখল ভিতরে তখনো অন্ধকার কাটেনি। এনি জানালা খুলে দিল। একগুচ্ছ আলো ঘরে ঢুকে ঘর আলোকিত করল, সঙ্গে এনির মনেও এক সুখের দোলা জাগিয়ে দিল।
সিধু তখন তার ঘরে ছিল না। সিধুর মা বললেন, ও মাঠে গিয়েছে। এনিকে আরও বললেন– বসতে। এনি সিধুর টেবিলে বসল। আশ্চর্য হয়ে লুফে নিল টেবিলের উপর থাকা এক টুকরো কাগজ। এ কাগজের এক পাশে কলমের কালি দিয়ে আঁকা রয়েছে। সেখানে পাহাড়ি রাস্তার ধার দিয়ে এক লোক তুলোর বস্তা নিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে রয়েছে তার ছোট্ট ছেলে। সে হাত উঁচিয়ে আনন্দে দুলাতে দুলাতে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের সামনে রাস্তার উপর একটি বাঘ দাঁড়িয়েছে। কাগজটির অপর পৃষ্ঠায় একটা কবিতা রয়েছে। এনি কবিতাটি চট করে পড়ে ফেলল। তার মধ্যে যেন একটা গল্পের স্বাদ পেল। কবিতার বিষয়বস্তু চমৎকার মনে হলেও শেষ লাইনটি এনির মন কেড়েছে। এনি নাটকীয় ভঙ্গিতে কবিতাটি আবার আবৃত্তি করতে লাগল। কবিতার আবৃত্তি প্রায় শেষের দিকে। সিধু ঘরে প্রবেশ করল। এনির আবৃত্তি এমন জায়গায় শেষ হলো যার পরের লাইনটি সিধু ধরল– “আর নাহি যাব ও পথে।”
এনি উত্তর কাটল– “তবে ওপথ চিনবে কী করে?”
এনি আরেকটি লাইন আওড়াল– “ও পথ আমি চিনতে চাই।”
–“এ লাইনটি আমার কবিতার অংশ নয়।”
–“অনেক কিছুই থাকে না, তবুও জীবনে এসে যায়।”
পৃষ্ঠা#২১
লেখক তার গল্পে আরও বুঝাতে চেয়েছেন– ‘জীবন হল নদীর স্রোতের মতো। ও পানি যত বিশুদ্ধই হোক না কেন নদীতে বহমান হলে অনেক কিছুকে সঙ্গী করে নেয়। আবার বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু রেখেও যায়। আবার ভিন্ন পাত্রের নামও ধারণ করে।’
লেখক তার বিচক্ষণতা প্রকাশ করতে চেয়েছেন। অসম বিয়ে বা সম্পর্ক বা প্রেম কতটা যৌক্তিক? অসম বিয়ের মূল তফাৎ কী– বয়স কম বা বেশি, এই তো? বয়স কম বেশিতে কি হয় এমন? প্রথমে ধরা যাক দেহ। একজন মেয়ে সে যে মেয়ে তার পরিচয় না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের বাঁধনে জড়ায় না। কিংবা একজন ছেলে সে যে ছেলে তার পরিচয় প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কে জড়ায় না। অন্যদিক থেকে ভাবলে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই যে বয়সটা অকেজো, সে বয়সেও এ বন্ধনে জড়ায় না। অর্থাৎ জীবনী শক্তি রয়েছে এমন সময়টুকুতে বিয়ে করানো হয়। সময়টুকুরও সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বয়সের মধ্যে তফাৎ কম নয়। যে অজানা ভয়গুলো অসাম্যের প্রতি তর্ক তুলে, সেই উপাদানগুলো কথিত মানদণ্ড হলেও সেসব ভয়গুলোকে দূর করা যায় কী?
লেখক আরও বুঝাতে চেয়েছে– ‘জ্ঞানের পক্কতার তারতম্য হয়। এ বিষয়টি নিয়েও লেখকের গুরুতর আপত্তিকর ইঙ্গিত করেছেন।’
দুপুর শুরু হয়েছে কিন্তু এখনও সকালের কোমলতা প্রকৃতিতে রয়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠ ভেদ করে যাওয়া সবুজ ঘাসে মোড়ানো রাস্তার উপর দু’জনে বসে রয়েছে। দু’জনের মুখেই স্ফীতঃ হাসি। এ জায়গাটায় যেমন গাছপালা নেই, তেমনি জনশূন্য।
যদি একটি মেয়ের হাতের মুষ্টিতে থাকা স্বর্ণের টুকরো থাকলেও একটা পুরুষের জবর-দস্তি করা চলে না। শেষে পুরুষত্বই খোয়া যায়। কিন্তু একটা মেয়ে যদি ছেলেটির মুষ্টি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে নেয়, তবে তাতে আনন্দ বাড়ে বৈ কমে না। এনির হাতে থাকা কাগজের টুকরো সিধু ছিনিয়ে নিতে না পারলেও সিধুর হাতে থাকা কাগজ এনি ঠিকই ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলো। এনি কাগজটি খুলতেই সিধু আবৃত্তি শুরু করে দিল—
—“আমার মনের কথা বলিতে পারি না,
কথাটা বাইরে আসতে চায়।”
এনির চোখ ভরা জল দেখে সিধু চুপসে গেল। কিছু বলা থেকে নিজে নিবৃত রইল। এনি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গভীর মমতায় বললো— “ভালোবাসি।’
আবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চাপা স্বরে বলল— “ঋষি।”
এনি আবারও— “লেখকগণ একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে,তাই না?”
সিধু— “যেমন?”
—“তারা অন্যের জীবনকে টেনে একাকার করে ফেলে।”
—“এখানেই তো তার সার্থকতা।”
—“লেখকগণ মনের কথা বুঝেন। মুক্তির পথ কী তা বোঝন না?”
—“তাদের কাছে হয়ত কিছু প্রশ্নের উত্তর অসংজ্ঞায়িত থাকে।”
পৃষ্ঠা#২২
এনি উঠে দাঁড়াল। সিধু নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। এনি এতক্ষণ যাবৎ হাতে রাখা কাগজের ভার সিধুকে অর্পণ করে নীরবে বাড়ির সম্মুখ পানে এগুতে লাগল। সিধু একই স্থানে বসে কাগজটা খুলে দেখে এটি একটি কবিতা। শিরোনামে লেখা– “ইনসুরেন্স।”
লেখক আরও বুঝাতে চেয়েছেন যে– ‘যে অনুভূতি দু’জনের মধ্যে, তা অপ্রকাশিত থাকলেও ওই অনুভূতির জায়গায় দু’জনেরই অন্তরমের জাগরণ একই রকম ঘটে থাকে।’ সিধু এনিকে যতটুকু পর্যবেক্ষণ করেছে অথবা সিধুর অনুভূতি জাগ্রত হয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে ‘ঋষি’ নামক কবিতার মাধ্যমে। অন্যদিকে সিধু এনিকে পর্যবেক্ষণ করে অথবা এনির অন্তরে যা খেলা করে তা ‘ইনসুরেন্স’ নামক কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কিছু মেয়ে থাকে যারা বিচক্ষণ গুণের অধিকারী। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই কবিতার মাধ্যমেই।
এনির মধ্যে প্রেম ধরা দিয়েছে। তাই সে মূর্ছা যাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করছে। অন্যদিকে মেয়েদের সচেতন কর্ণার, শুভ ব্যাপারেও শুভ হিসেবে গ্রহণ করতেও যুক্তির মঞ্চে দাঁড় করায়। এমনই দোলাচলের পরিণামের একটা ছায়া প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতার মাধ্যমে।
সিধু কখনও ভাবতেই পারেনি তার মত সচেতন মানুষের মনে প্রেম ধরা দিবে। তাও আবার অ-সম প্রেম। তবে তার মনে যতটুকু উঁকি দিয়েছিল তা আজ কিছুটা উবে গেল। খানিকটা বিবেক লজ্জায় পতিত হল।
লেখক তার গল্পে আরও বার্তা দিতে চেয়েছেন– ‘মন পরিণাম নয় বরং ভালো লাগা দিয়ে পূর্ণ হতে চায়।’ মানুষ যন্ত্র নয়। তাই কর্ম বিরতিতে মন তার ভালো লাগাকে টেনে আনে। তাই তো মানুষ স্মৃতি থেকে মুক্তি পায় না। স্মৃতি হল সুখের ফিনকি হাসি কিংবা চোখের কোণে ছলছল জল, যাই আনুক না কেনো স্মৃতিচারণ শেষে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়তে বাধ্য করবেই। জীবনে ভালো লাগার কিছু ঘটনা ঘটা মানেই সেটার পরাধীনতায় পড়া। এ শিকল বড়ই নিষ্ঠুর। তোমারই মন তোমাকে কাঁদাবে। তুমি যখন ভালো লাগার যন্ত্রণাটা সয়ে এসেছ আর ঠিক তখনই আবার সেই ভালো লাগা টা ধরা দিবে। তবে তোমার বিচলতা বেড়ে যাবে উন্মাদের মত যুক্তির মঞ্চ ভেঙে পড়বে। পরম সুখের মঞ্চ তোমারই চোখের সামনে মঞ্চায়িত হবে। ঠিক এমন ঘটনা সিধু ও এনির ক্ষেত্রেও ঘটেছিল।
তারা ভেবেছিলো, প্রেম ভালোবাসার ক্ষেত্রে মনে সবারই উদ্রেক হতে পারে। এটা দোষের কিছু না। আমরা কি সিধু’র উদ্রেককে প্রাধান্য দিয়ে এমন সম্পর্ক নষ্ট করব। ভালো লাগার প্রখরতর অবস্থা হল ভালোবাসা। তবে দু’জনের এখনও সেই পর্যায় হয়নি। এনি আরও ভাবল যে, আগামী সপ্তাহে তার বাবা তাকে নিতে আসবেন। শহরে চলে গেলেই সব শেষ। সুতরাং এ মান-অভিমান অর্থহীন।
যত সহজে ভাবা তত সহজে পূর্বের অবস্থানে ফেরা সম্ভবপর হলো না। দেহ চললেও মন বাধা দেয়। আবার মন চললেও দেহ নিশ্চল হয়ে পড়ে।
পৃষ্ঠা#২৩
একদিন সিধুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসটি নিয়ে পড়তে বসেছে। ঠিক এমন সময় নীল রঙের একটি কলম চোখে পড়ল। মুহূর্তেই মনে হল কলমটি তার নয়। এই কলমটি সে মনের খেয়ালেই হস্তগত করেছে। কলমটি মূলত এনির। সিধুর ভেতরকার ভালো মানুষটি যেন প্রচণ্ডভাবে চেপে বসল। এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল, কলমটি প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কালক্ষেপণ না করে এনিদের বাড়ির দিকে রওনা দিল।
লেখক তার গল্পে আরও বোঝাতে চেয়েছেন— ‘মন এক আশ্চর্য ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত হয়।’ যাকে হৃদয় থেকে গভীরভাবে ভাবা হয়, সেই ব্যক্তির মনেও একটা দোলা লেগে থাকে। এক অজানা টান অনুভূত হয়। এটা অলৌকিক সংযোগ। সিধুর মন বিচলিত হওয়ার একটা উপলক্ষ ছিল, কিন্তু সেদিন এনির কী উপলক্ষ ছিল যে ওই সাতসকালে সিধুর আসার পথের উপর পায়চারি করতে হবে? সিধুর কাছে সেদিন অন্তত একটি উত্তর ছিল, সে কেনো এসেছে? কিন্তু এনির কী কোনো উত্তর জানা ছিলো? এটা প্রেম ছিল কী না, লেখক তা স্পষ্ট করেননি। তবে আত্মিক সংযোগের একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সিধু আর এনির মাঝে আবার ভাব জমল। পেছনের সকল মান-অভিমান চুকে গেল। রাস্তার পাশে পাতা মাচার উপর বসে বিস্তর কথা হল। আবার তর্ক হল। এই প্রথম সিধু একটা বিষয়ে আপত্তি তুলল আর এনি তাতে সাবলীলভাবে সায় দিল। আর তা হল— ‘দেবদাসের করুণ মৃত্যু।’
দু’জনের মাঝে অনেক কথা হল। নিন্দুকের কী-ই বা আর বুঝতে পেল, ওরা দু’জনেই বুঝল দু’দিন আগের সময় আর বর্তমানের মধ্যে কী তফাৎ হয়েছে? দু’জনের আলাপচারিতা খুবই সাবলীল ছিল। কিন্তু কোথাও যেন একটু লাজ ছিল, ছিল সংকোচ। কিছুটা বাধ্-বাধ্ লাগছিল।
এরপর সব স্বাভাবিক হতে লাগল আরও। যেমন সম্পর্ক বাড়ে তেমন ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে। পরস্পরে যেন এক অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। রোজকার দেখা করা, কথা বলা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়। তাদের মধ্যে আর একটা রুটিন দাঁড়ালো কবিতা চালাচালি করার। চিঠি সরাসরি ইঙ্গিত বহন করে, কিন্তু কবিতা তো তা নয়। কবির মনে কত কিছুই উদয় হয়। সেসব অনুভূতি থেকে দুই-একটিকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কবিতা। কবিতায় মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া যায় না।
সিধু দিল ‘প্রাণ তব প্রাণ’ কবিতাটি। আর এনি দিল ‘সমর্পণ’ কবিতাটি। এনির ‘সমর্পণ’ কবিতাটির মাঝের দিকে লেখা ছিল—
“কী যে খোঁজে বেড়াই— জানি নে,
কী যে আঁকি— বুঝি নে।
চাওয়াটা প্রখরতর—
এর শেষ কোথায়, পাইনে।”
অন্যদিকে সিধু তার উৎসর্গ করা ‘প্রাণ তব প্রাণ’ কবিতার শেষে লিখেছিল—
“প্রাণ বুঝলে না প্রাণের কথা,
ঠিক আছে তবে থাক।”
পৃষ্ঠা#২৪
পরস্পরকে উৎসর্গ করা কবিতা দুটিতেই দেখা যাচ্ছে অন্ত্যমিল। অনুভূতিগুলো দু’টি রাস্তা থেকে এক রাস্তায় মিলিত হয়েছে।
লেখক এ গল্পের মাঝের কিছু পর, এমন এক বন্ধনে দুজনকে আবদ্ধ করালেন যেখানে পরস্পরকে আশ্বস্ত করেনি, এমন কি কথাও দেয়নি। তবে দু’জনের অন্তরমে স্বর্গীয় উদাসীনতা উপলব্ধি প্রকাশ পাওয়া শুরু করে। এ উদাসীনতা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাল যে, শুধু ঘুমানোর সময়টুকু বাদে আর বাকি সময়টুকু যেন কবুতরের জোড়ার মতো হয়ে রইল।
এ গল্পে লেখকের দূরদর্শিতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন– প্রাতঃকালে দু’জনের সাক্ষাতের মাধ্যমে। সেদিনই প্রথমবার কবিতার মাধ্যমে হলেও সিধু এনি বলেছিল— “ভালোবাসি।”
লেখক জীবনে অনেকবার অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছেন। সব বিষয়ই সমাজ জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক। যতবারই লিখেছেন, তাবারই বাস্তবতা ও কল্পনার সমন্বয়ে একটি যৌক্তিক চিত্র উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু লেখক এবার একটা বাড়তি এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পেয়েছেন যা আগে কখনও পাননি। আর তা হল লেখকের লেখা ঘটনার বাস্তব প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। টাটকা ফলাফল পেয়ে লেখকও বেশ উচ্ছ্বসিত।
কথা ছিল মিলি শুধু প্রেম করতে চাইবে, কিন্তু প্রেমে পড়বে না। অন্যদিকে লেখক বারণ করেছেন, কারণ প্রেম খেলা নয়। মন এমন একটা বিষয়, যা একবার ছুটে গেলে আর আঁতুড়ঘরে ফিরে আসে না।
লেখকের সঙ্গে মিলির সারাদিন দেখা হল না। পুকুর পাড়ে এমন একটা ঘটনার পর মিলির সঙ্গে লেখক সাক্ষাতের প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেল। নাহ, তবুও দেখা হলো না। বিকেল বেলা গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটার সময় লেখক স্বপনকে ইতস্তত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন– “মিলিকে দেখছি না যে।”
স্বপন— “ও চলে গিয়েছে। মিলি একটা পাগলি। সকালে না খেয়েই চলে গিয়েছে।”
লেখক আশ্চর্য হয়ে বললেন— “কেন? কিছু বলে যায়নি?”
—“বলেছে। এখানে নাকি ওর ভালো লাগছে না। অবশ্য ভালো না লাগার কারণও আছে।”
—“কী কারণ?” (ইতস্তত হয়ে।)
—“এত বড় হয়েছে, এখনও ওর বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও বেশিদিন থাকেনি।”
লেখক এক অস্ফুট নিঃশ্বাস ছাড়লেন। এই যাত্রায় যেন বেঁচে গেলেন। লেখক বুঝলেন আর কালক্ষেপণ করা চলে না। গল্পের ইতি টানা উচিত ছিল। পরক্ষণে এটাও ভাবলেন— ‘মিলি তো…’।
পরের দিন সকালবেলা নাস্তা শেষে অদূরে নদীর পাড়ে পাটি বিছিয়ে বসলেন। সঙ্গে কলম খাতা। লেখা শুরু করার আগে লেখক পুরোপুরি নিজেকে একটা যৌক্তিক অবস্থানে নিজেকে উপস্থাপন করলেন। সেই স্তর থেকে ঘটনার প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালেন। তিনি সেই সঙ্গে ভাবনার বিষয়বস্তু বা ঘটনাটি সামাজিকভাবে কিংবা জীবনের ক্ষেত্রে কতটা যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক এ বিষয় নিয়ে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত মনে মধ্যে ধারণ করলেন।
পৃষ্ঠা#২৫
লেখক ভাবলেন— ‘মানুষ সঙ্গবদ্ধ জীব। সঙ্গবদ্ধ পরিবেশেই তার আগমন আবার সঙ্গবদ্ধ ভাবেই পরিপুষ্ট হওয়া; এমনকি শেষ পরিণতি যাত্রাও। তাই কেউ চাইলেই এ গণ্ডি থেকে বের হতে পারবে না/পারে না।’ সঙ্গবদ্ধ পরিবেশে কিছু বিশ্বাস এমন হয় যার হয়তো কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বটে; তবুও অমান্য করার ভীতি রয়েছে। সেটা হোক না কোনো কুসংস্কার। তবুও সে কুসংস্কারের বয়স কয়েকটা যুগের মানুষের জীবনের যোগফলের চেয়েও বেশি। এ ধারণার দেয়ালকে মানুষ কী আর সহজে ভেঙে বেরোতে পারে? মানুষের মাঝে যেটা ভয় সেটা হল আমি যা করছি তা কী সঠিক? ভুল হলে শুধরানো যায় কিন্তু জীবন দর্শনের ভুল শোধরানো যায় না। তাই তো অনেক মানুষের জীবন থেকে বস্তাবন্দি পঁচা গন্ধ বের হয়।
লেখক ভাবতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন, জীবনটা যেন একটা গণিতের সমীকরণ। এপাশ-ওপাশের ভারসাম্যের মতোই এর প্রতিটি কর্মের ফল নির্ধারিত হয়। এক আর এক যোগ করলে সমীকরণের অন্য পাশে দুই আসে। ঠিক তেমনি জীবনের প্রতিটি কর্ম বা ভাবনা সঠিক হলে ওপাশে পুরস্কার অপেক্ষা করে। আর ব্যতিক্রম হলে শাস্তি।
লেখক তার ভাবনার আরও গভীরে গিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপবিষ্ট হলেন যে, পরিণতিতে তাই-ই ঘটবে, যা হওয়ার কথা। তেল-জল বলুন কিংবা বিশুদ্ধ ও ঘোলা পানির মিশ্রণই বলুন. একবার একই পাত্রে এলে তাদের আলাদা করা দুরূহ; আর এক সুতায় গাঁথা হলে তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় অসম্ভব।
মানুষের আগমন ও চিরস্থায়ী গমন সেই একা হলেও যে সময়টুকুর জন্য মানুষ স্বাধীনতা ভোগ করে, সেই সময়টুকুর শ্রম, মেধা, অহংকার দিয়ে বহু স্তর তৈরি করা হয়। আমরা যে যুগে বসে সাম্যের কথা গাইছি সে যুগে সাম্য নেই। এ যুগে সবার চাহিদা, অধিকার সমান নয়। কিছু বিষয় আছে খাবার ও পড়ানের বাহিরে যা এনির জন্য স্বাভাকি কিন্তু তা সিধুর জন্য কল্পনার বাহিরে। এনির মাথায় খেলে স্বাধীনতা, স্বাধীন চেতনা। অন্যদিকে সিধুর পরাধীনতা হলো— এই পরাধীনতা ভেঙে স্বাধীন হওয়ার হিম্মত তার নেই। এই সমাজে রয়েছে তার পরাধীনতা। এই পরিবার তার পরাধীনতা। জন্মগতই পরাধীনতা। মা-বাবা না খেয়ে, না পরে সিধুকে বড় করার ত্যাগের প্রতিদানে পরাধীনতা। তবুও মন সোহাগের আশায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গকে জাগ্রত করে তোলে। অবশেষে সিধু হার মানে যায় তার সমাজ, তার সংসারের পরাধীনতার কাছে। বিবেকের প্রখরতার সমস্ত সোহাগকে দাবিয়ে রাখা পারতে হয়। তাই তো সমস্ত প্রাণীর মাঝে আমরা মানুষ বলে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করি। অতঃপর সিধু তার শেষ লেখাটি এনির দাদির হাতে দিয়ে চলে এল।
সিধু দাদিকে জিজ্ঞেস করেনি এনি কোথায়? অন্যদিকে দাদিও বলেনি এনি তার নিজের ঘরেই রয়েছে। অজানা এক টানে এনি ঘর থেকে বের হয়ে এল। ততক্ষণে সিধু বড় রাস্তা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। দাদি কাগজটি হাত বাড়িয়ে দিল। কাগজটি এনির বুক নয়, প্রাণকেই আবিষ্ট করল।
এনি শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে কাগজটির ভাজ খুলল। খুলে দেখতে পেল একটি কবিতা। তাতে লেখা ছিল—
পৃষ্ঠা#২৬
টুটা অক্ষ
জন্মপূর্ব অন্ধ, জন্মাতীত অন্ধ,
রহিল মোর জীবন ময়,
ইহাতেই তবে চোখ মেলাতে—
বসিছ বিধি তুমি হিসাব কষিতে।
ঝুলিয়া পাল্লা পৈতা নিজ হাতে।
কী লীলা তোমার আপন মনে—
চক্ষু দিলা, লোভ দিলা, ক্ষমা দিলা অন্তরে।
ইহারই ঘূর্ণিতে টুটে গেল হিসাব—
সমানে ওপাশে বেরোল বেহেশত-দোজখ।
গাধার কোন বাঁধা নাই,
ভয় শুধু নিজ প্রাণের।
মানুষ বানিয়েছো শত বাঁধা দিয়ে,
বড় ভয় দিয়েছ তারে মরণের পরের।
শত শত যুগ ধরে মানুষ লুফিছে—
সত্য সন্ধান, শান্তি, মুক্তির তরে।
কত শত বাণ আরও কত মান,
চর্চায় উৎকৃষ্ট আরও কত শ্রমে।
কত কাঠগড়া কত সাদা পায়রা উড়তি,
কত সাজ, কত পরিল ক্ষিতি।
এমনও জালে কত কী যে মিলে,
দক্ষ-নির্বোধ-যোগী-পাপাত্ম ঝিলমিলে।
কী সে মোদের লক্ষ, অলক্ষ কী সে,
অগোচরেই বেশি। আর—
গোচরে লোভ-অলোভ অভিগ্রস্ত।
পৃষ্ঠা#২৭
“মন হল মানুষের চলার অবলম্বন। আর এই মন যে হারাবে, সে নিজের অহমিকাকে হারাবে।”
অক্ষি খোলিয়া দিলে বিধি অক্ষ দেখিতে,
অক্ষ বুঝিবার জ্ঞান দিলে।
নিষ্পাপ তুমি তাই মোদের অস্থি ছেড়ে দিলে।
লীলা। হা হা হা লীলা। হুম লীলা।
এনির জন্ম হয়েছে ভাবনার স্বাধীনতা নিয়ে। সে খুবই আদরে বেড়ে উঠেছে। কোন কিছু আবদার করে পায়নি এমন কোনো ঘটনা তার মনে নেই। তার রক্তেই মিশে রয়েছে জয় করবার দৃঢ় প্রত্যয়। তার বাবার পকেট খালি না কি ভরা তা জানবার কখনো প্রয়োজন পড়েনি। কাজেই তার চাওয়াটা প্রকট। সিধুকে প্রকট ভাবে চায় সে। সিধুই কেবলমাত্র ব্যক্তি যে এনির কথা/দুঃখ বুঝে। এনি আবার তার সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে ত্যাগ করা শিখেছে, জয় করার কৌশল শিখেছে, ভদ্রতা শিখেছে। সমাজকে চিনেছে, মনকে জয় করা শিখেছে। কিন্তু তা বাস্তবিক অর্থে নয়, সে শুধু জ্ঞানের রাজ্যেই।
এনির মন ভালো নেই, তাই সে কান্না করছে। অবশেষে মধ্যরাতের আধারে মোম জ্বালিয়ে এভারেস্ট জয়ের বাসনায় সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি দিয়ে চিঠি লিখতে বসেছে।
“প্রিয় মুকুট বর,
আমি তোমার বধূ নই। তবুও তুমি আমার বর। আমি স্বশ্রদ্ধ জ্ঞানে নিজেকে তোমার পায়ের তলে সোপর্দ করেছি। আর এই বলে নিজেকে সোপর্দ করেছি যে— ‘তুমি আমার।’
আমি তোমার কাঙ্গাল—
যত আনন্দে থাকি বা বেদনায়, তুমি আমাকে ক্ষণিকের তরে নিঃসঙ্গ করে দাও। আর তক্ষুনি বুকটা কম্পিত হয়ে ঝড়ো বেগে নিঃশ্বাস বের হয়ে যায়। তুমি আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছ। অনুভূতিও কেড়ে নিয়েছ, পায়ে বেড়ি পরিয়েছ। আমি আমাতে নেই আর।
পৃষ্ঠা#২৮
হে প্রেমিক,
ভেবে দেখো না কেন যুগ যুগ ধরে দৃশ্যমান। চোখ খুলে দেখ– বড়দের স্নেহ/মমতা অতুলনীয়। তাই বলে ভেবো না তাদের অবাধ্য হব।
আমার সিধু,
ফুলটি ফোটার আগেই মুকুলটা বিনষ্ট হোক এমন ঔদার্য নিশ্চয় তুমি দেখাবে না। ভালোবাসি কথাটি আরও গভীরে স্থান পাক। এ বিশ্বাসকে টেনে-হিঁছড়ে উপড়ে ফেলো না– প্রিয়।
মিনতি হে সখা
মাসের পর মাস,
যুগের পর যুগ।
লোকাল আধারে,
জাত-মান-কূল ডুবিয়া,
ঘুমের সাগরে ভাসিল সকলে।
কোথায় কিংবা কেহ–
যাপিল রাত জান হে?
প্রাণের সখা গুজিলে
মাথা নিজ বক্ষ গুহে।
তবেই তো সে ঠাই তার
শান্তি, তন্দ্রার নেশা জাগে।
কী যে খেলা আপন লীলায়,
বসিয়া রহিছ হে দূরপানে।
হেথায় তোমারি আর আমার
আরাধ্যের যষ্ঠি মূর্তি হে–
কত রঙ্গ করে। তাহারি–
ভাবনায় মোর অন্তর দোলে,
ভাবিতে-হাসিতে-ঢুলিতে-লুটিতে।
শূন্য কলস, পত্রহীন বৃক্ষ,
নির্ঘুম চোখ, জোছনাহীন রাত, চ‚র্ণ-বিচ‚র্ণ প্রাণ,
আঙ্গুলির আঘাতে টুটা সাদা পাতা,
ছুড়ে ফেলা প্রাণ, নিথর দেহ।
মিনতি সখা- অতীত হতে দিও না,
বাঁচিবার মোর বড়ই অভিলাষ।”
পৃষ্ঠা#২৯
পুবের সূর্য পশ্চিমে অনেকটাই হেলে পড়েছে। গল্পের পরিণতি একটি যৌক্তিক আসনে বসানোর জন্য লেখক বাস্তবতা কিংবা তার ভাবনার সব দিক থেকে একটি যৌক্তিক মঞ্চে দাঁড় করতে চাচ্ছেন। সিদ্ধান্তে প্রায়ই উপনিত হতে পেরেছেন। লেখক দূরের ওই সদর রাস্তার উপর দোয়েল পাখির মতো ক্ষণিকের জন্য মিলির মতো কাউকে দেখতে পেলেন। মিলিকে ঘিরে এ তো অনুভূতি মিথ্যে হয় কি করে? মুহূর্তেই ভাবনার মঞ্চ ভেঙে গেল। তাকে এক অজানা শক্তি বাড়ির দিকে টেনে আনল।
চেতনা বলে যে একটা কিছু রয়েছে লেখক এর আগেও প্রমাণ পেয়েছেন। এমনকি এ চেতনা সত্য। কোনো এক গুরুজন লেখককে প্রশ্ন করেছিলেন– ‘ভালো-মন্দ দুই ধরনের পরিস্থিতির ক্ষেত্রে চেতনা সাড়া দেবে; তবে বিপত্তি ঘটে কোন সিদ্ধান্তকে চেতনা বলে মেনে নেবে– সেখানে।’ লেখক আজও তার সত্যতা পেলেন।
মিলি আবার স্বপনদের বাড়িতে চলে এসেছে। মিলির সঙ্গে লেখকের দেখা হল কিন্তু বিশেষ কোনো কথা হলো না। লেখক বিদায়সূচক দু-একটি ভদ্রতামূলক কথা বললেছেন। তখন কিছু উপলব্ধিতে বোঝা গেল যে, তিনি মিলিকেই খুঁজছিলেন। অন্যদিকে মিলি শুধু একটি প্রশ্ন করার জন্যই আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু কার্যত এর কিছুই হলো না। তাদের মাঝে কেমন যেন একটা বাঁধ-বাঁধ ভাব কাজ করছে। পরে বলবে বলে দুজনেই তাদের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে রাখল।
রাতের খাবার খাওয়ার জন্য টেবিলে বসেছে সবাই। অতঃপর লেখকের কথা বা অভিমত শুনে মিলির অভিমান চরম পর্যায়ে উঠল। বলেন কি না– দু’দিনের ছুটি চান। তাঁর বন্ধুর বাড়ি যাবেন। সেখান থেকে এসে শহরে চলে যাবেন। কোনো অসুবিধা হচ্ছে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে সাবলীলভাবে উত্তর দিয়ে স্বপনের মাকে বললেন- “কলেজ জীবনের এক বন্ধু- ডাক্তার। ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জায়গায় থাকে। ওর সঙ্গেই দেখা করতে যাব। শুনেছি এখান থেকে পঞ্চাশ কি.মি. দূরে।’
মিলি আপত্তি সুর দিতেই লেখককে উদ্দেশ্য করে স্বপন বলে উঠেন– “ভালোই তো। তবে আয় ঘুরে।”
মিলির সারা রাত ঘুম হলো না। অবশ্য লেখকেরও সারা রাত ঘুম হয় নি। চেয়ারে বসে রইলেন। স্বপনের খেয়াল, লেখক তার গল্প নিয়েই ভাবছেন। সত্যিকার অর্থে লেখকের ভাবনায় সিংহভাগ জুড়েই ছিল মিলি। সমাজ যা ঘৃণা করে, কিন্তু ভাবনায় তা অনায়াসেই উচ্চাসনে বসাতে পারে। লেখক মিলিকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখতেই তার স্ত্রীর মুখখানা উজ্বল হয়ে ভেসে উঠল। স্বপন দেখল, লেখক বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তবুও স্বপন লেখককে ডেকে কোনো বিঘ্ন ঘটালেন না।
মিলির মাথায় একবার জেদ চেপেছিল– লেখকের সমস্ত লেখনি টেনে-হিঁচড়ে জব্দ করে নেবে। ডাক্তার বন্ধু না ছাই। লেখকের দূরে যাওয়ার কারণ মিলি কিছুটা ঠাহর করতে পেরেছিল।
পৃষ্ঠা#৩০
🌺 আরও দেখি- ছোটগল্প
রাত তখন পৌনে এগারোটা বাজে। স্বপনের দরজায় কড়া নাড়া দিল। এ সময় কার আগমন ঘটতে পারে তা ওদের দু’জনের বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। লেখক উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। এমন অসময়ে আসার হেতু জিজ্ঞেস করলেন; তখন মিলি উত্তর করল–
“বাঁধন হারা’ উপন্যাসটি দেবেন? ঘুম আসছে না।”
টেবিলে রাখা বইয়ের সারির মাঝ থেকে লেখক উপন্যাসটি বের করে মিলির হাতে তুলে দিলেন। মিলি বলল–
“এটা থাক। বরং সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প সংগ্রহ নিয়ে যাই।”
স্বপন উত্তর কাটল– “বেঁচে থাক্ সর্দি-কাঁশি।”
লেখক– “অসাধারণ।”
একটা হাসির মাতম পড়ল।
পরের দিন ভোরবেলা ডাক্তার বন্ধুটির সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে লেখক রওনা দিলেন। বাইর বাড়ি পার হয়ে বড় রাস্তার মোহনায় মিলি উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক– “মিলি।”
মিলি ঘুরে দাঁড়াল।
লেখক– “আগামী পরশু ফিরে আসব। এখানে আমার কাজ শেষ। তুমি কি শেষ করতে পেরেছ? আগুন নিয়ে খেলার আরও একদিন সময় পাবে।”
মিলি মৌনতার আড়াল থেকে জিজ্ঞেস করল– “মুক্তি নাই?”
লেখক নিরুত্তরে চলে গেলেন। লেখক যে উত্তরটি দিতে চেয়েছিলেন, তারই পরিণতি হয়তো একদিন ঘটবে। কিছু ব্যাপার রয়েছে মিলি তা বুঝতেও চেষ্টা করত না। সবই খেলা; তবে সবাই কি তা করতে পারে? জীবনে অনেক কিছুই হারাবে। হারানোর ব্যাপারটা ভুলেও যাবে; তবে সব কিছুই কি ভুলতে পারবে। যে আঘাতে মারা যাবে সে আঘাত আঘাত নয়। মৃত্যুর উসিলা মাত্র। আঘাত সহ্য হয়, ভুলেও যায়। তবে কিছু আঘাত মৃত্যুপুরী অবধি ঘুরপাক করাবে। লেখকের বারণ অমান্য হেতু মিলি এমন খেলায় নেমেছে। তাই আজ তার এই অস্বাভাবিকতা। ধোঁয়াটে ঘরের অস্বস্তিবোধ মিলির অন্তরকে ছাপিয়ে বিষাদে পরিণত করেছে। সে আজ এটাও অনুভব করেছে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা সময়ান্তে চক্রবৃদ্ধি হারে পীড়াদায়ক। মিলি তার এক বড় বোনের কাছ থেকে শুনেছিলো– ‘প্রেম নাকি অন্ধ।’
নিজের বোধ একসময় নিজেকে ভাবনার উল্টো দিকটা থেকে ভাবাবেই। মিলি আজ তার প্রমাণ পেয়েছে। মিলির অন্তরে হা-হুতাশের অনুভূতিতে পৃথিবীর সমস্ত কিছু যদি একদিকে পড়ে থাকে, আর অন্য দিকে মিলি ও লেখক, তবুও প্রত্যাশা থাকবে পৃথিবী চাই না। সেই সাথে উদ্রেক হবে আকাশকুসুম কল্পনার। তবে এও পরক্ষণে উপস্থিত হবে, সে আজ কী করছে? যা পাওয়ার নয়, অর্জন করবার নয়, যা কেবলই আকাশের ওই নীলের মতো অধরা। দিনের শেষে মিলির মনে আরও প্রশ্ন তৈরী করবে, তার কী কোনো কাজ নেই? নিজস্ব জগৎ নেই?
পৃষ্ঠা#৩১
মিলি নির্জনে পুকুর পাড়ে দুর্বা ঘাসের উপর বসে দেখছে– ‘পুকুরের জল বাতাসের তাড়নায় সারিবদ্ধ চিকন ঢেউ তুলছে। আবার পরক্ষণেই অন্য ঢেউয়ের সাথে ঢেউ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। জীবনের কিছু প্রশ্ন সত্যিই কি এমন করে গুঁড়িয়ে যায়, মিলিয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত কিছুই স্নায়ুর বলয়ে আবিষ্ট। তাই যদি না হত, এমন কেনো হয়– বায়ু বয়, বৃষ্টি হয়, রাত আসে, দিন আসে, কাউকে বেশি মনে পড়ে।
কোনো রকম রাতটা শেষ করে পরের দিন এগারোটার মধ্যেই লেখক ফিরে আসেন। চিন্তা যদি ভাবনার স্তরেরও ওপরে চলে যায়, তবে মুখে এক ধরনের স্ফীত হাসি বিরাজ করে। প্রকৃতপক্ষে সেই হাসির পেছনে হাসার মতো কোনো কারণ না থাকলেও তাদের দু’জনের খুশুখুশু ভাবটা সবাইকে আনন্দ দিতে সক্ষম হল।
মিলি স্বপনের ঘরে হাজির। লেখক ঘরের মেঝেতে পায়চারি করছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছুটা বিচলিত। স্বপন সেখানে ছিল না। মিলিকে দেখা মাত্রই লেখক মিলির কাছে আসেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে হাতে দিলেন। আর এমনভাবে কাগজটি দিলেন, যেন বিরাট কিছু কুড়িয়ে এনেছেন। এবং তা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। এবং স্বস্তি পেলেন। তারপর অনুরোধ করলেন, এখনই যেন কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনা হয়। মিলি তাতে চোখ বুলিয়েই বুঝতে পেল, এটি সেই বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতা এবং লেখকেরই লেখা। কবিতাটির উপরে ছোট্ট করে লেখ ছিল— ‘উৎসর্গ— মিলিকে।’ এমন আতিথ্য পেয়ে মিলি অতি আনন্দের সঙ্গে পাঠ করতে লাগল-
মানস
খেলার ছলে নতুবা তা স্বর্গের বলে,
বুঝে-না বুঝে নতুবা হে মনের বাঁজি।
অন্ধের যষ্ঠি, ছকড়া-নকড়া করলে,
মূর্খ নাকি জ্ঞানী যা বল হারাবে সে জী।
মন আগি তুষে, জল বনের অনলে,
বিরহী– ‘কাতর, চেতনা অস্বস্তি, বাজি।’
শূন্য শূন্য প্রাণে আকণ্ঠ যে পুড়ে-জ্বলে,
প্রাণ উদাস; দেখালে রঙ্গ-রঙ্গি সাজি।
এই আট লাইন পড়া শেষ হলে মিলির অনুরোধে লেখক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন-
“প্রত্যেকে তার মনকে সমর্পণ করার পায়তারা করে। অনেক সময় নিজের চেষ্টায় হয়, আবার অনেক সময় অলৌকিকভাবে ঘটে যায়। মন হল মানুষের চলার অবলম্বন। আর এই মনকে যে হারায়, সে নিজের অহমিকাকেই যেন হারায়।”
———-০০০০০০৩২
মিলি দ্বিতীয় প্যারা আবৃত্তি করতে উদ্যত হলে লেখক তাকে থামিয়ে হাত চেপে ধরলেন। আর বললেন–
“ফুল কি তার নিজ সৌন্দর্যের প্রতি ওয়াকিবহাল? তার সুবাসে অন্যের মন ভরে যায়, পুলকিত হয়। কিন্তু ফুলের ওই ব্যক্তির প্রতি কী কোনো আগ্রহ থাকে? থাকে না! ফুল আগ্রহী না থাকলেও তাকে কি ভালোবাসবে না? ভালোবাসবেই। কারণ ওই ফুলের মন জয় করবার গুণ আছে। তবে এই জয় করা, আবার তা একদিন হারিয়ে ফেলা— এ-ই তো প্রকৃতির খেলা। এসব মেনেই জীবনে উদ্দ্যমী হতে হয়, ভালোবাসতে হয়।”
মিলির চোখে জল চলে এল। ইতোমধ্যে স্বপনের আগমনী আওয়াজ পাওয়া গেল। মিলি পুনরায় আবৃত্তি করতে লাগল-
ভুলের সাগরে পা বন্ধু আর কত ঘা,
বাঁচিতে হবে উদ্দ্যমে– এই মর্ম বীণা।
পুষ্প কি জানে নিজের শ্রী-বিভূষণ ঘাঁ?
পুষ্প চৈতন্য বিনা তাহে প্রীতি হবে না!
প্রকৃতির পুঁতা খাঁদ-কূট এ প’দ ঘা,
কোলে-কোল, কাঁধে-কাঁধ, দুঃখে-দুঃখ -জ্বীনা।
চর্তুদশ কবিতার মত কঠিন কবিতা রচনার জন্য স্বপন খুবই আনন্দিত হলেন। সেই সাথে লেখককে বুকে জড়িয়ে যথাযোগ্য সম্মান জানালেন। লেখকও আবেগে অভিভূত হলেন।
এর কিছুক্ষণ পর লেখক বের হয়ে পড়লেন নদীর পাড়ের সেই স্থানটির দিকে। উদ্দেশ্য একটাই— আজ তার গল্পের ইতি টানতে হবে। মানুষের মনের কোন একটি জায়গা রয়েছে, হয়ত যে জায়গাটা অসম্পূূর্ণ এবং সেই জায়গার প্রচণ্ড রকম আকর্ষণ শক্তি বা পূর্ণ হওয়ার শক্তি রয়েছে। তাই তো মানুষ সব কিছু থাকা সত্ত্বেও এমন অনেক তুচ্ছ ব্যাপার রয়েছে যার সংস্পর্শে গেলে অলৌকিক ভাবে মন ভালো হয়ে যায়। লেখক তার লেখা গল্পটি শেষ করতে ডা. বন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে শান্ত মনোরম পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে লেখক তীব্রভাবে অনুভব করলেন সব ঠিক থাকলেও নদীর পাড়ের সেই অনুভূতি আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
লেখক নদীর পাড়ে দুর্বা ঘাসের উপর বসে চিন্তা-যুক্তি-বাস্তবতা আর মন— সবকিছুকে বিবেচনায় রেখে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে লাগলেন। প্রায় আধঘন্টা চলে গিয়েছে। লেখক কিছুই লিখতে পারলেন না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা রস-বড়ই (অর-বড়ই) বের করে উঠে দাঁড়ালেন। চিবুতে চিবুতে এক-দুই কদম পায়চারি করতে লাগলেন। এমন সময় দেখলেন স্বপনদের বাড়ির সামনের রাস্তায় টিয়ে রং-এ শাড়ি পড়ে কেউ একজন পায়চারি করছে। লেখকের বুঝতে কোনো অসুবিধেই হলো না, ওই ব্যক্তিটিকে! এ মন লীলা। লেখক আবার ঘাসের উপর বসে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস গাঢ় করে তুললেন এবং লেখা শুরু করলেন।
পৃষ্ঠা#৩৩
🌺 আরও পড়ুন- সনেট
“সমাজ যা ঘৃণা করে, ভাবনায় তাকে অনায়াসেই উচ্চাসনে বসানো যায়।”
এনি- “প্রেম স্বর্গীয় ব্যাপার। প্রেম পৃথিবীকে এক নতুন দর্শন শেখায়। এ নেশা প্রাকৃতিক। তুমি আমাকে জয় করেছ। আমি নিজেকে স্বজ্ঞানে সমর্পণ করেছি। আমার হাত ধরে রেখো।”
সিধু– “তবে আমিই কেন সেই পুরুষ? আমি নাম-পরিচয়হীন এক ঘরের সন্তান। বলতে পারো আমার বাবা-মা এক মুঠো জমি কেনার মত সম্পদ করার অর্থ একত্রিত করতে পারবে না বলেই দৈনিক খাবারের খরচ থেকে দু-চার টাকা বাঁচিয়ে আমার খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন। আমাকে পড়িয়েছেন। এমতাবস্থায় আমার নায়ক হওয়া সাজে না। কোথা থেকে কি হল জানি না, তবে তুমি বিনা এ মন মরুভূমি হয়ে উঠবে। বাঁচিবার স্বাদ টুকু হারাব।”
এদিকে মিলি নবপ্রেমিকের মতো দূরে পানে অস্থিরতায় পায়চারি করছে। অন্যদিকে লেখক তার স্ত্রী-সন্তানের অপেক্ষা। অন্যদিকে প্রিয় স্থানে বসে নিজ কাজের যৌক্তিক সমাধানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই সফলাতার উপর লেখকের সমস্ত সাফল্য নির্ভর করতেছ। এ মুহূর্তটা আনন্দ-বেদনার যাই হোক না কেন সাধারণ মানুষের কাছে মনে হবে এটি বিধির অত্যাচার। কিন্তু একজন লেখকের কাছে এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
লেখক এসবের ঊর্ধ্বে ওঠে গিয়ে অবশেষে শেষ করলেন তার কাঙ্ক্ষিত বাসনা। লেখার কাগজগুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে চোখ বেয়ে এক ফোটা অশ্রু বের হয়ে আসেন। লেখক চোখ খুলতেই তার ছোট্ট মেয়ে দ্বীনার আব্বু আব্বু সুর কানে বেজে উঠল। আর তিলক্ষণ দেরি করা চলে না তার। তাই তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লেন।
তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। স্বপন আর লেখক মিলে ট্রেনের টিকিট কাটতে গেলেন। ট্রেন ছাড়বে ভোর পাঁচটার দিকে তারা টিকিট কাটতে পেরেছেন। যথারীতি রাতেই সকলের কাছ থেকে লেখক বিদায় নিয়ে নিলেন। মিলির কাছ থেকেও হাসিমুখে বিদায় নিয়ে নিলেন। লেখকের সারা রাত ঘুম হলো না। অবশ্য স্বপনও ঘুমাতে পারেনি। একথা-সেকথা সারা রাত ধরে চলে। তারপর লেখালেখির ভবিষ্যৎ। স্বপনের জীবন দর্শন ও তার নানান দিক। অবশ্য এ আলাপচারিতার আড়ালে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সঠিক সময়ে ট্রেনে ওঠার।
অতঃপর ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে। এখান থেকে স্টেশন তিন কি.মি.। আগের দিনই রিকশা বলে রাখা ছিল। যেহেতু সন্ধ্যায় বেলায় বিদায় নিয়ে রাখা ছিল, তাই এ রাতের বেলায় কাউকে ডাকা দিয়ে বিদায় নেওয়ার তাগিদ ছিল না আর। তবে লেখকের মন ক্রমেই বিচলিত হয়ে উঠতে লাগল। তার মনের মধ্যে কে যেন বারবার বলছে, মিলি দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই হয়ত কাছে এসে বলবে, বিদায়।
না! মিলির দেখা মিলরো না। লেখক ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। লেখকের প্রত্যাশাটা যখন ক্ষীণ হয়ে আসল, তখন স্বপনকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন-
“মিলি জাগেনি।”
স্বপন ইতস্তত হয়ে বলল– “ও গত কালই চলে গিয়েছে।”
পৃষ্ঠা#৩৪
লেখক আড়ষ্ট হয়ে পড়লেন এবং থেমে গেলেন। মিলির কথা উঠতেই স্বপনের মনে পড়ে গেল, গত সন্ধ্যায় মিলি একটি খাম রেখে গিয়েছে। স্বপন ঘরে ফিরে গিয়ে খামটি নিয়ে এসে লেখককে দিলেন আর বললেন–
“তাড়াতাড়ি চল বন্ধু, না হয় ট্রেনটি মিস করবে।”
লেখক খামটি ডান হাতে চেপে ধরে কী যেন এক দুঃখ বোধের মৌনতার ভার নিয়ে রিকশায় উঠে বসলেন। চিঠিটির জন্য মিলিকে মন থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। মিলির ঠিকানা জানবার কথা লেখক স্বপনকে বলতে চেয়েছিলেন। কেনো যেন বলতে পারলেন না। সময় মত স্টেশনে পৌঁছালেন এবং ট্রেন ছেড়েও দিল।
লেখকের এ গ্রামে আসার হেতু সফল হলো। কিছু ক্ষেত্রে চাওয়ার অতিরিক্তই পাওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আনন্দেটা তাকে বড্ড বেশি ক্লান্ত করে তুলছে। তবে একটা কথা সত্য, লেখক মূলত এখানে এসেছিলেন নিজের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতিই। তা যথার্থই হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, সে কী ততোধিক পরিমাণে কিছু হারিয়ে ফেলেছেন যা তার হৃদয়কে আমৃত্যু শূন্য করে রাখবে?
‘ঠ’ বগির তেপ্পান্ন নম্বর আসন। পাশের জনের সাথে কোশল বিনিময় করে হাতে থাকা মিলির খামের দিকে মনোযোগ গেল। খামের এক পাশ ছিঁড়ে লেখক একটা বুষ্কা কাগজের ছেড়া পৃষ্ঠা বের করলেন। তার উপরের অংশে লেখা–
“কান্না, হাসি, হতাশা, পথ ভোলা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ।” তার ডান পাশে বাঁকা করে লেখা–
“ উৎসর্গ– প্রিয় মন হন্তারক-কে।”
এরপর একটি গান– ঘুম ঘুম আয় ঘুম,
আ হা হা হা আ..
ঘুম ঘুম চোখে ঘুম,
আয় ঘুম। আ হা হা হা আ..
প্রজাপতি বাহারি রঙে,
উড়ে নিপুণ পাখা মেলে।
দোল খায়–
দোল খেলানো ফুলের পরে,
ডুবে ডুবে মধু নিয়ে।
ঘুম ঘুম আয় ঘুম,
আ হা হা হা আ..।
পৃষ্ঠা#৩৫
রাজ কুমার এলো শেষে,
পঙ্খিরাজ ঘোড়ার পরে।
সোনা-দানা সবই রেখে,
নিয়ে গেল রাজকুমারীকে।
ঘুম ঘুম আয় ঘুম,
আ হা হা হা আ..
ঘুম ঘুম চোখে ঘুম,
আয় ঘুম। আ হা হা হা আ..
এর শেষে যা লেখা তার জন্য লেখক একেবারে প্রস্তুত ছিলেন না। লেখক ইতস্তত হয়ে স্যুটকেস খুললেন। স্যুটকেস খোলার ভাবখানা এমন ছিল পাশে বসা লোকটি তটস্থ হয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। লেখকের আফসোস আর মাথার চুল টানার ভঙ্গি দেখে ওই যাত্রী কিছু জিজ্ঞেস করে জানার প্রয়াসটুকু পেলেন না। লেখক আবার অর্ধছেঁড়া কাগজটি হাতে নিলেন। ক্ষেপে গিয়ে হাতের মুষ্টিতে চেপে ধরলেন। কাগজটি জানালা দিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করবেন ঠিক এমন সময় যাত্রীটি জিজ্ঞেস করলেন–
“মূল্যবান কিছু হারিয়েছেন?”
লেখক তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালেন।
যাত্রী– “হারিয়েছেন?”
লেখক গোঙানোর মত আওয়াজ দিলেন– “হু।”
লেখক কাগজটি মুষ্টি থেকে খুলে আবার দৃষ্টি দিলেন। দেখলেন তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা– “আপনিই সঠিক। আমি হেরেগিয়েছি। তবে এটুকু বুঝেছি, ভালোবাসায় অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। আপনার লেখা ‘সঙ্গ বিষ’ উপন্যাসের শেষ পরিণতি হবে আমার জীবনের শেষ পরিণতি দিয়ে।”
মানুষের রাগ হল ঘুড়ির মতো। এক সময় মাথার উপরে উঠে আবার পরক্ষণেই মাটিতে পড়ে। লেখকের পাশের যাত্রী বেশ ভদ্র ও মার্জিত। লেখক তার কাছে তার পরিচয় সহ সমস্ত ঘটনা ব্যাখ্যা করলেন। ঐ যাত্রী তাকে পরামর্শ দিলেন–
“কিছুদিন পর অভিমান পড়ে গেলে মিলিকে বুঝিয়ে কাগজটি সংগ্রহ করতে পারবেন।”
পরের সপ্তাহে লেখক আবার স্বপনদের বাড়ি আসেন। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছে। মিলি নিউজিল্যান্ডে বসবাস করা কাকার বাসায় পাড়ি জমিয়েছে। অনেকদিন ধরে মিলির যাওয়ার কথা চলছিল কিন্তু সে যায়নি। এবার সে নিজেই ইচ্ছা পোষণ করেছে। তাই দেরি না করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পৃষ্ঠা#৩৬
স্বপন লেখকের ঘটনা শুনে মিলিকে মেইল করেছেন, ফোনে কথা বলেছেন। অনেক ভাবে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ফল হয়নি। প্রতি বারই মিলি এড়িয়ে গিয়েছে। এক পর্যায়ে স্বপনের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
পরবর্তীতে লেখক বহুবার ওই গল্পের শেষ টুকু লিখেছেন। বহুবার ওই গ্রামে গিয়েছেন। সেই নদীর পাড়ে বসেছেন। বহুবার একই পরিণতি এনেছেন; কিন্তু তৃপ্তি আসেনি। বহু সতর্কতার সাথে লিখলেও কী যেন বাদ পড়ে যায় বারবার। কী যেন হৃদয়ঙ্গম হয় না।
লেখক শুধু এটুকু বুঝেন– ‘হয়নি।’
আজ দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে সেই গল্পের ইতি টানছেন, কিন্তু হচ্ছে না। হয় নি।
জাতীয় দৈনিকে অসমাপ্ত অবস্থাতেই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে করে তার খ্যাতি এসেছে। নেপথ্য কথা দেশবাসী শুনেছে। এছাড়া তার আরও বড় বড় লেখা লিখেছেন, প্রকাশিতও হয়েছে। তবুও আজ অবধি তাঁর সেই শেষ পাঁচ পৃষ্ঠার জন্য মন কাঁদে। গল্পের সমাধান মিলেনি।
পরবর্তীতে পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মিলি সেখানে এক ভারতীয় বাঙালিকে বিয়ে করে সুখেই আছে। তাদের একটি সন্তানও আছে। কিন্তু লেখক, মিলি সেই সুখী থাকার বিষয়টা আজও বিশ্বাস করেন নি। লেখক তার এক কবিতায় মিলির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই যন্ত্রণাকে ‘দহন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
লেখাক তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে হৃদয়ে একট ক্ষত নিয়ে ফিরেছিলেন। হয়ত মিলির ক্ষেত্রেও। তবে এ ক্ষতির শেষ কোথায়? এর শেষ পরিণতি কী? একটা দৃশ্য কল্পনা করা যায়, সাজানো যায়, গড়া যায়। সেই দৃশ্য শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও কেন তা হৃদয় ঘরে বাস করে। কষ্ঠ দেয়। আশা জাগায়। মনকে ক্লান্ত করে তোলে। এতো ঘটবে, তুষের আগুনে গ্রাস করে নেবেই। আর জানা সত্বেও প্রেম নাম নেশায় কেন ডুব দেওয়া হলো? মিলি তা মানতে না চাইলেও লেখতো বিষয়টা জনত। সে কেন সমর্ক করে গেলো। তবে কী মনের তলে আরেক রসদ জমে উঠেছিল? যে ভেলকীর নাম প্রেম! আর মন মার সঙ্গী? আর মন কী তবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে? ও কী (মন) তাহলে উদাস, মুক্ত, স্বাধীন। মুনিবের সুখ-দুঃখের ধার ধারে না– সে। ও স্বার্থপর।
লেখক সেই গ্রামে গিয়ে বন্ধুর বাড়ি থেকে একটা ক্ষত নিয়ে ফিরেছিলেন। মিলির ক্ষেত্রেও হয়ত তাই ঘটেছে। দু’জনের তবে কী ক্ষতি হল, কী হারাল! হারানো বিষয়টা আর ফিরে পাওয়া যাবে না? বিষয়টি তাহলে বেঈমানি, নির্বোধ, স্থানান্তরিত হয়। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ও কী (মন) তাহলে উদাস, মুক্ত। মনিবের সুখ-দুঃখের ধার ধারে না। ও স্বার্থপর।
পৃষ্ঠা#৩৭
-***-
উপন্যাসঃ লেখক
তারিকুজ্জামান তনয়
জুন’২০১৯ | ময়মনসিংহ সদর |
🪭
🌺 আরও দেখি- ছোটগল্প
🌺 আরও দেখি- কবিতা
🌺 আরও দেখি- আর্ট
🌺 আরও দেখি- উপন্যাস
🪭
“মন সবসময় ক্ষুধার্ত থাকে। যা চায় তা সে পেলেও, তৃপ্তি কি মেলে…!”
“যে আঘাতে মারা যাবে, সে আঘাত আঘাত নয়। মৃত্যুর উছিলা মাত্র।”
“মানুষের রাগ হল ঘুড়ির মতো। এক সময় মাথার উপরে উঠে আবার পরক্ষণেই মাটিতে পড়ে।”
🍁
-
Facebook | 🔵 f : facebook.com/bonopushpa
- Instragram | 🔷 www.instagram.com/tariquzzamantonoy/
-
YouTube | 🔴
: @tariquzzamantonoy3123
- 🐦 Twitter | 🔵 T : @bonopushpa
- 🌐 Website | 🔷 www.bonopushpa.com