এক মাঝির গল্প | ব্রহ্মপুত্র নদীর পটভূমিতে মানবজীবনের বাস্তবধর্মী বাংলা ছোটগল্প
এক মাঝির গল্প 🍁
তারিকুজ্জামান তনয়
মানুষের হৃদয়কে নিষ্ক্রিয় করে তোলার জন্য নানান প্রকার আয়েশী উপাদানগুলো তার চোখের সামনে নাচানাচি করানোই যথেষ্ট। আর এর ফলেই বেশির ভাগ মানুষ ভুল পথে পা বাড়ায়। আন্দালিব নামক একজন মাঝি এমনই এক আয়েশী জীবন কাটানোর কথা কল্পনা করেছিল। অবশেষে তার নৌকার দাঁড় টানার জন্য একজন দিনমজুরকে নিয়োগ দিলেন। লোকটা বেশ শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান এবং সেই সাথে বুদ্ধিমানও বটে। মোদ্দাকথা, চোখ বন্ধ করে ওই ব্যক্তির উপর নৌকার ভার দেওয়া যায়।
দিনমজুরের নাম রাহুল। নৌকাটি বেশ পুরোনো। ইতিমধ্যে পাটাতনের দিকটায় বেশ কয়েকবার ছিদ্র হয়েছে। তাই খুব সাবধানে নৌকার দাঁড় টানতে হয়। এসব বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে রাহুল ও আন্দালিবের মধ্যে। রাহুলের দিন হাজিরা দেড়শত টাকা। সকাল দশটা থেকে রাত নয়টা অবধি তার দায়িত্ব। এর মাঝে যাত্রী না হলেও দিনমজুরির নির্ধারিত অর্থ বা পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ যাত্রী থাকলেও আর না থাকলেও দেড়শত টাকা পরিশোধ করতেই হবে।
স্থানটি ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলার সংযোগ স্থলে অবস্থিত। নদীর নাম– ব্রহ্মপুত্র। নদীর পাড় ঘেরা গ্রামটি বেশ সুন্দর। নদীর পাড় জুড়ে রয়েছে নানান রকম ছোট-বড় গাছ-গাছালি। বড় গাছগুলো নদীর কিনারা থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। যাত্রীদেরকে পায়ে হেঁটে বালুরচর পেরিয়ে গ্রামের সদর রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়।
পৃষ্ঠা- ০১
নদীর ঘাটের উত্তরপাড় ঘেঁষে একটি বাজার রয়েছে। এ বাজারটির একটি হাটবার রয়েছে। অর্থাৎ সপ্তাহের একটা দিন বিশেষভাবে গ্রামের লোকজন তাদের চাহিদা মতো বাজার-সদাই ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন। যেদিন হাটবার থাকে সেদিন নৌকার উপর যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রী পারাপারে ভিড় জমে থাকে। এখানে মূলত গ্রামের জমিতে কিংবা বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত ফসলাদি বেশি বেচা-বিক্রি হয়। যেমন: মাছ, শাক-সবজি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল-মূল ইত্যাদি। এছাড়াও কিছু পণ্য আছে যা যন্ত্রের সাহায্যে উৎপাদিত হয়ে থাকে। হাতে তৈরি জিনিসপত্রগুলোর দাম একটু বেশি; অন্যদিকে যন্ত্রে তৈরি জিনিসপত্রের দাম অপেক্ষাকৃত কম।
তাছাড়া রোগী পারাপারে এই নৌকাটি ব্যবহার করা হয়। স্কুলগামী ছাত্র-শিক্ষক, কর্মজীবী, পেশাজীবী মানুষগুলোও পারাপার করে থাকে।
নৌপথে যাত্রীভাড়া বেশ সস্তা। তবুও উপযুক্ত ভাড়া পরিশোধের ক্ষেত্রে যাত্রীদের নানান বাহানা থাকেই। তাই অনেক সময় ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু আন্দালিব বেশ কড়া লোক। তাই সচরাচর কেউ ভাড়া পরিশোধ না করে যেতে পারে না।
রাহুলকে দিনমজুরি হিসেবে নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো, মেশিনের সাথে পাল্লা দিয়ে চলা। মানুষ তো আর মেশিন নয়, বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। কিন্তু যাত্রী তো আর নৌকার মাঝির অবসরের সময় দেখে পারাপার হতে আসবে না। তাছাড়া ওই ঘাটে আরও মাঝি আছে। একটু বাড়তি আয়ের আশায়, আর আয়েশী জীবনের জন্যই নৌকায় দিনমজুর(মাঝি) রাখা হয়েছে।
পৃষ্ঠা- ০২
আন্দালিব সেদিন খুব ভোর বেলায় ঘাটে পৌঁছালেন এবং নৌকার যথাযথ মেরামত শেষে যাত্রী পারাপার শুরু করে দিলেন। যেহেতু রাহুল এসে আন্দালিবকে সঙ্গ দিয়ে পরবর্তী সময়টুকুর দায়িত্ব নেবে, তাই তিনি ভোর বেলাতেই ঘাটে এসেছিলেন।
সকাল দশটার দিকে রাহুলের আসার কথা ছিল। কিন্তু সে প্রায় এক ঘণ্টা দেরি করে আসে। তার বাড়ির একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে রেখে সকালের খাওয়াদাওয়া শেষ করে আসার জন্য এই বাড়তি সময়টুকু লেগে গিয়েছে। আন্দালিব বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নেন। এবং রোগীর খোঁজ-খবরও নেন।
আরও দেখি- ছোটগল্প
আরও দেখি- কবিতা
আন্দালিব প্রায় দেড়টা পর্যন্ত যাত্রী পারাপার করলেন। এই সময়ের মধ্যে রাহুলকে নৌকা বাইতে দেন। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া তুলতে দেন। এখানে বলে রাখা ভালো, রাহুলের বাবার নৌকা ছিল। সে এই ঘাটে যাত্রী পারাপার করতেন। রাহুল পুরুষ হয়ে উঠলে সে তার পিতার সাথে নৌকা বাইত। সেবার বন্যার মধ্যে তার পিতা মারা যান। এর কিছুদিন পর রাহুলের হাতেই সেই নৌকাটি যাত্রী পারাপারের সময় পাটাতন ভেঙে ডুবে যায়।
অনেকদিন পর রাহুল আবার নৌকা বাইতে পেরে সে বেশ উচ্ছ্বসিত। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রেই প্রফুল্লতার ছোঁয়া বিরাজমান। কয়েকজন যাত্রী রাহুলের প্রশংসা করল। এই সময়ের মধ্যে কাজে তেমন কোনো ভুল বেরোলো না। এদিকে রাহুল হিসাব-কিতাবেও বেশ কড়া। সব মিলে রাহুলকে পেয়ে আন্দালিব বেশ খুশি হলেন। এতে করে রাহুলের প্রতি আন্দালিবের আস্থার আলো ক্রমেই উজ্জ্বল হতে লাগল।
পৃষ্ঠা- ০৩
আন্দালিব যখন রাহুলের উপর দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন তখন আন্দালিব রাহুলকে সতর্ক থাকার বিষয়গুলো আবার মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন। রাহুল বেশ মনোযোগ দিয়ে সব শোনে নিল এবং আন্দালিবকে আশ্বস্ত করল।
তখন প্রায় তিন ঘণ্টা পার হয়ে গিয়েছে। পড়ন্ত বিকেল। অনেক যাত্রীর সমাগম হয়েছে। যাত্রীও বেশি হওয়ায় আয়ও বেশি হয়েছে। এজন্য বেশ প্রফুল্ল ছিল। অন্যদিকে আন্দালিব গোসল শেষ করে খেয়ে-দেয়ে শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়েছেন। স্বামী ঘরে থাকার জন্য তার স্ত্রী বেশ খুশি হয়েছে। নিজ হাতে রান্না করে গরম খাবার খেতে দিয়েছে। আবার তার চোখের সামনেই আয়েশে ঘুমিয়েছেন। একজন সতী-বউয়ের জন্য এ দৃশ্য বড় শান্তির, বড় পবিত্র, বড় তুষ্টির।
ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আন্দালিব ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। রাহুল তখন নৌকা নিয়ে এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে। তখন নৌকাটি প্রায় মাঝ নদী বরাবর পৌঁছে গিয়েছে। নদীর মাঝ বরাবর স্রোত বেশি থাকে। আন্দালিব তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত এক পড়শির সাথে গল্প করছেন। আর সেই সাথে ওপারে চলে যাওয়া নৌকার দিকে তাকিয়ে দেখছেন।
এমন সময় হঠাৎ করেই দেখতে পেলেন নৌকায় থাকা যাত্রীরা বিচলিত হয়ে উঠছে। নৌকাটি ডুবে যাচ্ছে। এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে ডুবেই গেল।
সংসার চালানোর শেষ সম্বলটুকু চোখের সামনে এভাবে ডুবে যাওয়া দেখতে কেমন লাগে তা সহজে অনুমেয়। নৌকার যাত্রী এমনকি রাহুলের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। সবাই সহিসালামতে পাড়ে পৌঁছতে পেরেছে।
পৃষ্ঠা- ০৪
আন্দালিব রাহুলকে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, পাটাতনে জমে থাকা পানি অপসারণ করেছিল কি না? একসাথে বেশি যাত্রী নিয়েছিল কি না? এমন প্রাসঙ্গিক নানান প্রশ্ন। রাহুলের দেওয়া উত্তর থেকে এমন কোনো কিছু পেলেন না যেখানে রাহুলকে দোষ দেওয়া যায়।
আন্দালিব খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। একে তার আয়ের পথ বন্ধ, তার মাঝে নৌকা ডুবে যাওয়ার শক্ত কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। আন্দালিবের বাড়িতে শোকের মাতম পড়ে গেল। রাহুল লজ্জিত হলো।
আন্দালিব কোনোভাবেই রাহুলকে দোষ দিতে পারছে না। আবার অন্যদিকে নৌকা ডুবে যাওয়ার বিষয়টাও বিনা কারণে মেনে নিতে পারছে না।
প্রবীণ একজন মাঝি একই পাড়ায় বসবাস করেন। বয়সের ভারে দাঁড় টানার সক্ষমতা নেই। রাত তখন নয়টা বেজে গিয়েছে। প্রবীণ লোকটা শুয়ে পড়েছিলেন। বয়স বেশি হওয়ার কারণে ঘুম যেন চোখ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। আন্দালিবের প্রথম ডাকেই প্রবীণ লোকটা সাড়া দিলেন। আন্দালিব পুরো বিষয়টা খুলে বললেন। এমনকি তার উদ্বেগের বিষয়টাও জানালেন।
আন্দালিবের মুখে সব ঘটনা শুনে প্রবীণ লোকটি হাসলেন এবং বললেন– নিজের ঘরের খুঁটিনাটি আর প্রয়োজনীয়তা কেবল ওই ঘরের কর্তা ব্যক্তিটিই জানে। পথচেনা ঘোড়ার কাছে ওই উঁচু-নিচু পথটাও সমতল লাগে। সবার হাতেই কী আর একতারায় কথা বলে?
এক মাঝির গল্প 🍁
তারিকুজ্জামান তনয়
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ঢাকা |
পৃষ্ঠা- ০৫
আরও দেখি- ছোটগল্প
আরও দেখি- কবিতা
আরও দেখি- আর্ট
আরও দেখি- উপন্যাস
“নিজের ঘরের খুঁটিনাটি আর প্রয়োজনীয়তা কেবল ওই ঘরের কর্তা ব্যক্তিটিই জানে।”
“পথচেনা ঘোড়ার কাছে ওই উঁচু-নিচু পথটাও সমতল লাগে।”
-
Facebook |
f : facebook.com/bonopushpa
- Instragram |
www.instagram.com/tariquzzamantonoy/
-
YouTube |
: @tariquzzamantonoy3123
Twitter |
T : @bonopushpa
Website |
www.bonopushpa.com