কিপটে জামাই ও তার চতুর স্ত্রী | হাস্যরসাত্মক বাংলা গল্প | তারিকুজ্জামান তনয়
কিপটে জামাই ও তার চতুর স্ত্রী
তারিকুজ্জামান তনয়
–
সেদিন ছিলো ৪ঠা অগ্রাহায়ণ (দিনটি ছিল শুক্রবার)। মুক্তার পক্ষের চাচাতো ভাই ঢাকার বাসায় আসার কথা। ও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নানান প্রস্তুতি নিচ্ছে। রান্নার ঘর থেকে নানান শব্দে ভেসে আসছে। আরামের ঘুমটা গেল ভেঙে। বিছানায় শুয়ে থেকেই শুনতে পেলাম তারা দুপুরে এসে খাবেন। আমার আবার সপ্তাহে সাত দিনই অফিস। তাই এক্ষুনি মুক্তাকে জানিয়ে বিদায় নেওয়ার উপযুক্ত সময় বলে মনে হলো।
এমন সময় মাথায় সিনেমার একটা প্লট জেঁকে বসলো। মুক্তাকে ডেকে এনে পাশে বসালাম। আমার লেখা সনেট “মেঘদূত” থেকে অষ্টক পর্যন্ত অনেকটা আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করলাম। লেখাটা বেশ ছিলো। তাছাড়া মেঘদূত সনেটের অন্তরনিহীত অর্থ বা শিক্ষা বোধটা বেশ গভীর। মোট কথা ওর পুরো মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হলাম। ফলাফল প্রত্যাশার চেয়েও ঢের বেশি এলো।
এর সাথে আমার কিছু স্বপ্ন বা ভাবনা জুড়ে দিলাম। অবশ্য এ ভাবনাগুলো সত্য সত্যিই আমাকে ভাবায়। এর মধ্য থেকে কিছু স্বপ্ন বাস্তব করতে মন দৃঢ় হয়ে ওঠে। সেই সাথে এটাও বোঝতে পেলাম, আমার দৃঢ়তার সাথে মুক্তারও একাত্মতা আছে।
রাত যত গভীর হয়, ভোর তত নিকটে আসে– ঠিক তেমন-ই ঘটে গেলো। ভাবনার গভীরতা যত বেড়ে গেলো, ভেঙে যাওয়ার অবস্থান তত নিকটবর্তী হলো। শেষে, মুক্তা একরাশ হাসি এঁকে বললো- ‘দুষ্টুমি ছাড়! এবার যাই।’
পৃষ্ঠা-০১
আমি বললাম- “শোনো শোনো! বরের কথা শোনলে হায়াত বাড়ে।” ও উঠে যাবে প্রায়, এমন সময় হাত চেঁপে ধরে আবার বসালাম। ঠিক গুরু আর শিষ্য যেমন করে বসে তেমন করে বসা হলো এবার। অর্থাৎ আমি চেয়ারে বসে আর মুক্তা মেঝেতে, এমনকি মনোযোগী ভক্তের মতো কাছাকাছি।
তখন জানালা দিয়ে আসা অগ্রহায়ণের প্রাতঃরোদ এসে আমার পিঠের উপর পড়েছে। নীরব রুম। আর মনের ভেতরে ফুলে-ফেঁপে ওঠা গল্প রস; আর হয়ত ওর মনের ভেতর যাতনা।
এমন মধুর ক্ষণে শুরু হলো আজকের গল্প-
কিপটে জামাই ও তার স্ত্রী
যদিও পকেটে নতুন টাকা থাকে, তবুও খরচ করে না। এ নিয়ে স্ত্রীর সাথে কিছুটা কাড়াকাড়ি আছে। সেদিন ছিল জৈষ্ঠ্যের কড়া রোদ মাখা দিন। ভ্যাপসা গরমের তোড়ে লোকটির আম খাওয়ার প্রতি নেশা চেঁপে বসেছে। সম্ভবত মৌসুমী ফলগুলো জিহ্বার স্বাদের আঙ্গিকে ফলন হয়ে থাকে।
অবশেষে লোকটি নতুন টাকার মায়া ত্যাগ করে বাজার থেকে দুটো আম কিনে নিয়ে আসে। সেই আমগুলোর প্রতি তার স্ত্রীর কেনো যেন বিন্দু মাত্র লোভ জাগলো না।
লোকটি আম দুটো ধোয়ে এনে সোফায় বসলেন। স্ত্রীকেও পাশে বসালেন এবং পরামর্শ চাইলেন। বললেন– “কীভাবে শুরু করবো- চাকু দিয়ে কেটে নাকি খোসা ছুলো?”
স্ত্রীর দেয়া উত্তরের অপেক্ষা না করে লোকটি আম ছোলিয়ে খেতে লাগলেন। মুশকিল হয়ে দাঁড়ালো, খোসার সাথে কিছুটা আমের মাংস ওঠে আসছে। স্বামীর কৌতূহল দেখে স্ত্রী বললেন– “এইটুকু আপনি কামড়িয়ে নিতে পারেন।”
পৃষ্ঠা-০২
কথা আর কাজের মধ্যে সময়ের কোন ফারাক রইলো না। এরপর অবশিষ্টাংশ খুব সাবধানে ছোলে নিলেন । এরপর খোসাতে লেগে থাকা অংশটুকু দাঁতের কর্তনে ছেঁটে নিতে লাগলেন।
এ কী কাণ্ড! হাত বেয়ে যে রস পড়ে যায়। এ অবস্থা দেখে স্ত্রী মুচকি হাসলেন। অতঃপর লোকটি জিহ্বার সদ্ব্যবহার করে বেয়ে পড়া রস সামলে নিলেন।
এবার সে আরও চিন্তায় পড়ে গেলেন। এতো দাম দিয়ে কেনা আম! তার এক ফোঁটা রস ও যদি মাটিতে পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তবে দামের সদগতি হবে না। বিকল্প উপায় হিসেবে যদি এর তলে থালা রাখা হয়, আর যদি থালাতে পড়ে যাওয়া রস তুলে নেওয়া হয়; তবে মন্দ হয় না। কিন্তু এ বিষয়টা কেমন যেন বেমানান লাগে। তাছাড়া বিষয়টি লোকটির কাছে কেমন যেন ছোটলোকি কাজ বলে মনে হয়।
এবার লোকটি যেই না রসালো আমে কামড় টি কাটলেন, আর অমনি আমের রস তরতর করে হাত বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। একদিকে মুখের ভেতরকার রস; অন্যদিকে চোখের সামনে হাত বেয়ে পড়া রস! মুখের রস শেষ না হলে তো আর হাত দিয়ে বেয়ে পড়া রসের সদ্ব্যবহার করা যায় না। এরই মাঝে কয়েক ফোঁটা রস মেঝেতে পড়ে গেলো।
এমন অবস্থায় কী করা উচিত তা পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে মুখ ফোটে বলতেও পারছেন না। টপাটপ কামড়—এরপর আবার—এরপর গিলে ফেলা। এরপর প্রায় ঝড়ে পড়া রসটুকুরও মুখে তুলে নেওয়া। এমন ব্যতিব্যস্ত পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়ে লোকটির রাগ তু্ঙ্গে উঠে গেল।
স্বামীর এমন বেগতিক দেখে শেষে একটা থালা এনে দিলেন। হাত থেকে যেই না এক ফোঁটা রস টপ করে পড়ে আর অমনি তার স্ত্রী থালাটা এগিয়ে ধরেন। ফলে আর কোনো রস মেঝেতে পড়ার সুযোগ পেলো না। এবার স্বামী স্বস্তি পেল।
তপ্ত রোদ থেকে আসা ব্যক্তির তেষ্টা পাওয়ার পর বিশুদ্ধ খাবার পানি পেলে যেমন প্রশান্তি লাভ করে ঠিক তেমনি তার আনন্দ অনুভূত হয়েছে বলে মনে হলো। লোকটা অতি সুখে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে বসলেন- “আঁশ টাও বুঝি খাওয়া যায়? খাবো না কি?”
স্ত্রী বললেন- “হ্যাঁ! পারো।”
পৃষ্ঠা-০৩
মুক্তা উচ্চ হাসিতে হেসে উঠলো। হাসির শব্দ শোনে ত্বহা এসে হাজির হলো। মায়ের হাসি দেখে সেও হাসতে লাগলো। না বুঝে হাসি দেওয়াটা সত্যিই কারুকার্যময়। আমিও আর না হেসে থাকতে পারলাম না।
আবার গল্প বলা শুরু করা হলো-
লোকটির স্ত্রী পরামার্শ দিলেন– “আঁটিতে অন্ততঃ কিছু আঁশ রাখো। মাটিতে পুঁতে দিলে চারা গাছ হতে পারে। ঠিক এমন স্বাদের ফল হবে। মাত্র সাত-আট টা বছরের ব্যাপার।”
লোকটা মুহূর্ত ক্ষণ কি যেন ভাবলেন; আর আঁটি টা রেখে দিলেন। আর দ্বিতীয় আমটা হাতে তুলে নিয়ে স্ত্রীকে বললেন- এটা কেটে নিয়ে আস।
স্ত্রী মজা করে বললেন- “কিছু আঁশ রেখে কেঁটে নেই?”
লোকটি এবার গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন। কোনো কথা বললেন না।
আম নিয়ে সোফা থেকে উঠবেন ঠিক এমন সময় লোকটি স্ত্রীর হাতটি চেপে ধরে বললেন– “একটু সাবধানে কেটো নিও। খোসায়…”
স্ত্রীর বিরক্তি ভাবটা কিছুটা হলেও বুঝতে পেলেন।
স্ত্রী যখন আম ধোয়ে নিচ্ছিলেন তখনও লোকটি একবার রান্নাঘর দিয়ে ঘুরে এসেছেন।
স্ত্রীও কম যানে না। স্ত্রী তার স্বামীকে বাটে ফেলার কায়দা এতো দিনে প্রায় রপ্ত করে ফেলেছেন। আমের খোসা না ফেলে চিরল-চিরল করে খোসা সহ কেটে প্লেটে এনে দিলেন। সাথে ছোট বাটিতে করে কিছুু পরিমাণ লবণ নিয়ে এলেন।
এমন পরিবেশনা দেখে লোকটার মন খারাপ। এ কি করেছে- তার স্ত্রী! লোকটা ধমকের সুরেই বললেন– “আমাকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলে না!”
স্ত্রী হেসে বললেন- “ছোবলা সহই আম খাওয়া যায়।” এই বলে স্ত্রী, নিজেই আমের একটা খণ্ড মুখে দিয়ে(খেয়ে) স্বামীকে দেখিয়ে দিলেন।
পৃষ্ঠা-০৪
লোকটা কৌতূহলী আর গম্ভীর হয়ে স্ত্রীর হাত থেকে আমের থালা নিয়ে খাওয়া শুরু করে দিলেন।
‘কিছুটা বেস্বাদ লাগলে সাথে লবণ নিতে পারেন।’- এই কথা বলে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তার স্ত্রী প্লেট থেকে আরেক খন্ড আম নিতে এগুতে গেলেেই লোকটা প্লেট সরিয়ে ফেললেন। আর বললেন- “আমি বুঝে নিয়েছি।”
আমাদের রুমে হাসির কলরব হচ্ছিলো। এতে তাসনীমের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ও সুবার রুম থেকে আমাদের রুমে চলে আসে। তাসনীমের ঘুমাতুর মুখ দেখে আমরা সবাই হাসি বন্ধ করে দিলাম। তাসনীম এসে মুক্তার কোলে বসলো। খেঁক করে কিছু হাসির শব্দ আছে না, ঠিক বন্যার পানির বাঁধ ভেঙ্গে যায় যেমন, ঠিক তেমন করে হাসি ছটা মুক্তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো। সেই সাথে আমাদেরও।
কিপটে লোকটার কান্ড কারখানা দেখে হাসির ঢল তাসনীমের প্রতি সহানুভূতির অংশটুকুও ভেসে গেলো। এতে করে তাসনীম হাসলোও যেমন কাঁদলোও তেমন।
গুরু রূপে- আমি নিজেই, আর শ্রোতা হিসেবে রয়েছে- মুক্তা, ত্বহা, তাসনীম। (আমরা) আর এক সাথে বসে থাকতে পারলাম না। আর কোনো কথাও বাড়ানো গেলো না। হাসতে হাসতে সবাই স্থান থেকে নিজ নিজ কাজের দিকে সরে গেলাম।
মুক্তা ডাইনিং রুমে গিয়ে ঘড়ি দেখে খেপে উঠলো- বেলা যে হেলায় যায়!
আমি তড়িঘড়ি করে গোসল সেরে কোনো রকম ডালভাত খেয়ে অফিসে এসে পড়ি।
পৃষ্ঠা-০৫
পরে জানতে পেলাম, মুক্তা তরকারী রান্না শেষ করে ওঠার আগেই গেস্ট চলে এসেছিল…(অতঃপর যা ঘটেছিলো তা আর জন সম্মুখে প্রকাশ না করি। সে রস আপন স্মৃতির ভান্ডারে আপনা আপনি নেচে নেচে ঘোরে বেড়াক। হয়ত পরে কখনো আবার এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।)
–
৪ঠা অগ্রহায়ণ’১৪২৯
শেহড়া পাড়া, মিরপুর, ঢাকা।
আরও দেখি- ছোটগল্প
আরও দেখি- কবিতা
আরও দেখি- আর্ট
আরও দেখি- উপন্যাস
“ভালোবাসার সংসারে কিপটেমিও কখনো কখনো হাসির উপলক্ষ হয়ে ওঠে, যদি পাশে থাকে একজন চতুর ও সহনশীল মানুষ।”
“সংসারের ছোট ছোট মজার মুহূর্তগুলোই একদিন স্মৃতির ভান্ডারে সবচেয়ে উজ্জ্বল আনন্দ হয়ে বেঁচে থাকে।”
-
Facebook |
f : facebook.com/bonopushpa
- Instragram |
www.instagram.com/tariquzzamantonoy/
-
YouTube |
: @tariquzzamantonoy3123
Twitter |
T : @bonopushpa
Website |
www.bonopushpa.com
Poribarer ei soto soto bishoygulu poribar k tike rakhe. Poribarer sondorjo baray.. good job.
Valo legesa..😊